সোমবার, ২৭শে মার্চ, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ এক ও অবিচ্ছেদ্য

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু একটি নাম নয়,বাঙালি জাতির আস্থার ঠিকানা।বঙ্গবন্ধু কোনো দলের নয়,তিনি পুরো বাংলাদেশের।যারা বাংলাদেশের অস্তিত্বকে বিশ্বাস করে না,তারাই শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে মানতে চায়না।এরা পাকিস্তানের প্রেতাত্মা।তারা মুক্তিযুদ্ধ মানেনা,স্বাধীনতা স্বাধীনতা মানেনা,বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা ও জাতীয় সংগীত মানেনা।কিন্তু যারাই বাংলাদেশকে স্বীকার করে তাঁরাই বঙ্গবন্ধুকে ধারণ ও লালন করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শৈশব থেকেই অন্যায়ের প্রতি যেমন ছিলেন প্রতিবাদী,ঠিক তেমনই গরীব অসহায় মানুষদের প্রতি ছিলেন সহানুভূতিশীল।এই অসাধারণ গুনটি তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রেখেছে।স্কুল বয়স থেকেই তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর কলকাতায় ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন।সেখানেই রাজনৈতিক জীবনের বড় পরিবর্তন আসে।শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক,হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীদের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক-দেড় বছর পরই বাঙালিদের মোহভঙ্গ হয়।শুরু থেকেই বাঙালিদের উপর অন্যায়,অবিচার,শোষণ,নির্যাতন নেমে আসে।পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিটি ক্ষেত্রে গর্জে উঠে তরুণ শেখ মুজিব।ধীরে ধীরে তিনি বাঙালিদের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসেন।প্রতিবাদকে সংগঠিত করতে তিনি সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।সে লক্ষ্যেই ১৯৪৮ সালে গঠন করেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ।আর ১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও কারাবন্দী থাকা অবস্থায় তিনি যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন।সাংগঠনিক দক্ষতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণে খুব দ্রুতই দলের রাশ বঙ্গবন্ধুর হাতে চলে আসে।তারপর সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি নির্বাচিত হন।১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে সম্মিলিত বিরোধী দলগুলো শেরে বাংলা ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে সরকার গঠন করে।মন্ত্রীসভার কনিষ্ঠতম সদস্য হিসেবে শপথ নেন শেখ মুজিবুর রহমান।

৫২-এর ভাষা আন্দোলন,৬৬-এর ছয়দফা,৬৯ এর গনঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে উঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে দেয়া হয় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি।১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ৬ -দফার পক্ষে বাংলার জনগণ নিরঙ্কুশ রায় দেয়।কিন্তু পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু করে।১৯৭১ সালের মার্চ মাসে উত্তাল হয়ে উঠে বাংলা।দূরদর্শী নেতা বঙ্গবন্ধু বুঝে যায় একমাত্র স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালিদের মুক্তি সম্ভব নয়।সেজন্যই ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন,‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’তারপর ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হায়েনারা ঢাকার ঘুমন্ত মানুষের উপর অপারেশন সার্চলাইটের নামে গনহত্যা শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষনা করেন।তারপর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বঙ্গবন্ধুর শারিরীক অনুপস্থিতি না থাকলেও বঙ্গবন্ধুর নামে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে।মুজিবনগর সরকারে বঙ্গবন্ধুই রাষ্ট্রপতি ছিলেন।প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাকে বুকে ধারণ করেই মুক্তিযুদ্ধ করেছে।

সময়ের পরিক্রমায় টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিব থেকে নেতাকর্মীদের প্রিয় মুজিব ভাই হয়ে উঠেছিলেন বঙ্গবন্ধু।আর বঙ্গবন্ধুর ডাকেই বাঙালিরা মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বঙ্গবন্ধু পান জাতির পিতার স্বীকৃতি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাঁর হাতেই বাংলাদেশের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।বঙ্গবন্ধুর হাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্বাস করতেন দেশটি হবে সবার।তিনি পাকিস্তানি দ্বিজাতি তত্ত্বকে ধারণ করতেন না।প্রত্যেকটি নাগরিকের সমানাধিকরণে বিশ্বাস করতেন।এজন্যই বাংলাদেশের সংবিধানের জাতীয় চারটি স্তম্ভের একটি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দিয়েছিলেন।

তিনি ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রেখেছিলেন।সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে স্থান দিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,‘আমরা ধর্মকে আইন দ্বারা পরিবর্তন করব না।মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে,হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে,বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে,খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে।আমাদের শুধু আপত্তি হলো এই যে ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না।’

বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিশালতা পরিমাপ করা খুবেই কঠিন।তিনি ছিলেন মহাসাগরের মতো।বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী,কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়া চীন’ বই গুলো পড়লে তাঁর সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।কঠিন দেশপ্রেম,বিশাল মহানুভবতা,দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্ব,মানুষের প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা,অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।তিনি বাঙালির প্রতিটি সংকটে পথ নির্দেশনা দিয়েছেন।এখনও বঙ্গবন্ধুর আদর্শই বাঙালির মুক্তির পথ দেখায়।নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বলেছেন,‘সাদা বাংলায় বঙ্গবন্ধু মানে বাংলার বন্ধু।শেখ মুজিবুর রহমান অবশ্যই তার চেয়ে বেশি কিছু;তিনি অতুলনীয়।তিনি বাংলাদেশের মহান রাজনৈতিক নায়ক,স্বাধীন বাংলাদেশ ধারণার রূপকার,বাংলাদেশিদের জীবনে বড় প্রভাবক,বাংলার সবচেয়ে নন্দিত মানুষ।আর যেটা বলা হয়ে থাকে,যথার্থই তিনি ‘জাতির পিতা।’

বাঙালিদের একটি স্বাধীন ভূ-খণ্ডের জন্য বিভিন্ন সময়ে অনেক সূর্য সন্তান স্বপ্ন দেখেছেন,সংগ্রাম করেছেন।কিন্তু কেউই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিনত করতে পারেন নি।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই মহান নেতা যিনি শুধু স্বপ্নই দেখেননি,স্বপ্নকে বাস্তবে পরিনত করেছেন।বাঙালিদের জন্য স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন।এজন্যই বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু এক ও অবিচ্ছেদ্য।একে অপরের পরিপূরক।তিনিই বাঙালির ধ্রুবতারা,আলোর দিশারী।বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট ‘দ্য টাইমস অব লন্ডন’ যথার্থই বলেছিল, ‘সবকিছু স্বত্তেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে।কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোনো অস্তিত্ব নেই।’সত্যিই তাই,বঙ্গবন্ধুকে ছাড়া বাংলাদেশের কোন অস্তিত্ব এখনও নেই,ভবিষ্যতেও থাকবেনা।একটা সময় বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু তারা পারে নাই।বরং তারাই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে।যতদিন বাংলা,বাঙালি ও বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বঙ্গবন্ধু সগৌরবে বেঁচে থাকবেন।

বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন।১০৩ তম শুভ জন্মদিনে বাঙালির মহানায়ককে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও শতকোটি প্রণাম।

লেখক:সাবেক ছাত্রনেতা ও সদস্য,সম্প্রীতি বাংলাদেশ।
ইমেইল:haldertapas80@gmail.

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষঃ