পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান আগামীকাল ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। এটি বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত, জলবায়ু সংকট, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়া এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার ওপর আস্থা কমে যাওয়ার এই কঠিন সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বোচ্চ পদে বসছেন এক বাংলাদেশি কূটনীতিক। তার এই মেয়াদকাল হবে এক বছরের।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় খলিলুর রহমান ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধন করবেন। তিনি জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হবেন।
তার এই দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘ চার দশক পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদ ফিরে পেল বাংলাদেশ। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে ৪১তম অধিবেশনে প্রথম কোনো বাংলাদেশি হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
গত ২ জুন গোপন ব্যালটে ড. খলিলুর রহমান এই পদে নির্বাচিত হন। তিনি পান ৯৯টি ভোট। অন্যদিকে তার একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিস পেয়েছিলেন ৯১টি ভোট।
জাতিসংঘের আঞ্চলিক পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থা অনুযায়ী এবারের সভাপতি পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য সংরক্ষিত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় চার মাস পর বাংলাদেশ এই অনন্য গৌরব অর্জন করে।
প্রধানমন্ত্রী নিজেও আগামীকাল সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন।
‘অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত’
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম আজ (সোমবার) খলিলুর রহমানের সভাপতি নির্বাচনকে একটি ‘অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত’ এবং দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তিনি বলেন, এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা নতুন করে বৃদ্ধির প্রতিফলন।
বিকেলে বাসসকে শামা ওবায়েদ বলেন, ‘আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া দেশের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য।’
তিনি জানান, দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা তৈরি হয়েছে। এটিই এ সাফল্যের অন্যতম কারণ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, এই সাফল্যের মূল কারণ হলো বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ফিরে আসাকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকৃতি দিয়েছে।’
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের খলিলুরকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক অঙ্গীকারের বিষয়ে বিশ্ববাসীর কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা গেছে।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববাসী দেখেছে যে জনগণের স্পষ্ট ম্যান্ডেট নিয়ে বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার গঠিত হয়েছে। আমি মনে করি, সেই আস্থার প্রতিফলনই দেখা গেছে সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনের ফলাফলে।’
তিনি বলেন, খলিলুর রহমানের পেশাদার কূটনৈতিক দক্ষতা, জাতিসংঘের সদস্যদেশগুলোর কাছে তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতাও নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছে। ভোটের প্রচারণার সময় বিশ্বের ৮১টি দেশে বাংলাদেশি মিশনের কর্মকর্তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টারও প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বাড়ানোর সুযোগ
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, এই পদে আসীন হওয়ার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অগ্রাধিকার ও উদ্বেগের কথা কার্যকরভাবে তুলে ধরার বড় সুযোগ পাবে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ‘আমি আশাবাদী যে আগামী এক বছর বাংলাদেশ এই দায়িত্বকে কাজে লাগিয়ে বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের বিভিন্ন অগ্রাধিকার ও উদ্বেগের কথা আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।’
তিনি বিশেষভাবে রোহিঙ্গা সংকটের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে পারবে। একই সঙ্গে টেকসই সমাধানের জন্য জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করবে।
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। এখন তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো সহযোগিতা চাইছে ঢাকা।
পাশাপাশি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব ঘিরে বৈশ্বিক পরিচিতি বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের লক্ষ্য বাস্তবায়নে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে আরও বেশি পরিচিত করে তুলবে এবং কূটনৈতিকভাবে নতুন সুযোগ তৈরি করবে। এর মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অগ্রগতি ত্বরান্বিত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।’
বাংলাদেশের সফট পাওয়ার
পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, ড. খলিলুরের বিজয় আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গঠনমূলক ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশকে ‘সফট পাওয়ার’ ও ‘উদীয়মান শক্তি’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, ভয়ভীতির পরিবর্তে সহযোগিতা, সংলাপ ও সদিচ্ছার পথেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ।
‘আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন’
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরও এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা হিসেবে দেখছেন।
বাসসকে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি এই দায়িত্ব পাওয়াকে বাংলাদেশের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা যেতে পারে।’
জুলাই বিপ্লবের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথমবার জাতিসংঘ সফর এবং বাংলাদেশের নতুন করে গণতান্ত্রিক পথে যাত্রার প্রেক্ষাপটে এ নির্বাচনের গুরুত্বও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এই প্রেক্ষাপটে একজন বাংলাদেশির জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পাওয়া দেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।’
তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে কোনো একক দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব না করে নিরপেক্ষভাবে ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সেবা করতে হয়।
তাই এই সুযোগকে বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তা অনেকাংশে ঢাকার কূটনৈতিক দক্ষতার ওপর নির্ভর করবে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ কার্যকরভাবে কূটনীতি পরিচালনা করতে পারলে, ড. খলিলুর রহমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়মকানুন ও এখতিয়ারের মধ্যে থেকে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
চাপে বহুপক্ষীয় কূটনীতি
নির্বাচনে জয়ের পর দেওয়া এক বক্তব্যে বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান নানা চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা এখন চাপের মুখে এবং জাতিসংঘ বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখোমুখি।’ এই অবস্থা বজায় থাকলে জাতিসংঘের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
জাতিসংঘের কার্যকারিতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা বাড়াতে সব সদস্যরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেন খলিলুর রহমান।
তার অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফেরানো, শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, মানবাধিকার সুরক্ষা, নারী ও কন্যাশিশু এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষা এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মান উন্নয়ন।
খলিলুর রহমানের মেয়াদকালেই পরবর্তী জাতিসংঘ মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়াটি অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর।
নির্বাচনে জয়ের পর খলিলুর রহমানকে অভিনন্দন জানান গুতেরেস। পেশাদার এই কূটনীতিকের ওপর তার পূর্ণ আস্থার কথা জানিয়ে বিশ্বসংস্থাকে শক্তিশালী করতে তার সহযোগিতা কামনা করেন মহাসচিব।
পেশাদার কূটনীতিক ও অর্থনীতিবিদ ড. খলিলুর রহমান ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। পরে তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের অধীনেও দায়িত্ব পালন করেন।
বহুপাক্ষিক কূটনীতি, উন্নয়ন অর্থনীতি, রোহিঙ্গা সংকট এবং জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক মতপার্থক্য নিরসনে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চলতি মাসের শেষের দিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উচ্চপর্যায়ের বিতর্ক শুরু হবে। এতে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান নিউইয়র্কে সমবেত হবেন।
সেই ঐতিহাসিক সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে একজন বাংলাদেশির নেতৃত্ব দান দেশের ভাবমূর্তিকে বিশ্বে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এটি দেশের জন্য একটি বিরল কূটনৈতিক অর্জন হিসেবেও চিহ্নিত হবে।







