05092021রবি
বুধবার, 03 মার্চ 2021 22:14

হুদা-মাহাবুব মুখোমুখি

নিউজফ্ল্যাশ প্রতিবেদক: দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা নিয়ে শুরু থেকেই সরব তিনি। তার সরব অবস্থান নিয়ে নির্বাচন কমিশনেও ছিল অস্বস্তি। কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ তার বক্তব্যের জবাব দেননি এতদিন। কমিশন কর্মকর্তাদের কেউ তার বক্তব্যকে একান্ত ব্যক্তিগত মত বলে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। কিন্তু এবার এই কমিশনারের অনেকটা মুখোমুখি অবস্থান নিলেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা। জাতীয় ভোটার দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার কমিশনে আয়োজিত আলোচনা সভায় একই মঙ্গে দেয়া বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন সিইসি। তার কণ্ঠে ঝরেছে ক্ষোভ আর খেদ। প্রধান অতিথি হিসাবে তিনি ২৫ মিনিটের মতো বক্তব্য দিয়েছেন। ভোটার দিবসের অনুষ্ঠান হলেও এ বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন অল্পই। বরং কমিশনার মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যের জবাব দিতেই ব্যয় করেছেন ২০ মিনিটের মতো। বলেছেন, মাহবুব তালুকদার ব্যক্তিগত স্বার্থে এসব কথা বলছেন। কমিশনকে হেয় করতে যা যা করার সবই করেছেন মাহবুব তালুকদার। অনুষ্ঠানে অন্য নির্বাচন কমিশনার এবং কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে জেষ্ঠ্যতার ভিত্তিতে সিইসি’র ঠিক আগে বক্তব্য দেন মাহবুব তালুকদার। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, একথা ধ্রুব সত্য যে, নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রে উত্তরণের একমাত্র পথ। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ, অংশীদারমূলক ও গ্রহণযোগ্য না হলে ক্ষমতার হস্তান্তর স্বাভাবিক হতে পারে না। নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য না হলে দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক অস্থিরতা ও ব্যক্তির নৈরাশ্য বৃদ্ধি পায়। এর ফলে নৈরাশ্য থেকে নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়ায় আশঙ্কা রয়েছে। নৈরাজ্যপ্রবণতা কোনো গণতান্ত্রিক দেশের জন্য মোটেই কাম্য নয়। দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আশা-আকাঙ্ক্ষা রূপদানের জন্য নির্বাচন কমিশনের ওপর সাংবিধানিক দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। এই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে আমরা গণতন্ত্র অস্তাচলে পাঠানোর দায়ে অভিযুক্ত হবো। বর্তমানে আমরা দেশব্যাপী পৌরসভা নির্বাচনের প্রায় শেষ পর্যায়ে আছি। আগামী এপ্রিল থেকে ধাপে ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। স্থানীয় নির্বাচনগুলোর গতি-প্রকৃতি দেখে আমার ধারণা হচ্ছে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনের যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ ও ভারসাম্য রক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তা হচ্ছে না। এককেন্দ্রীয় নির্বাচনে স্থানীয় নির্বাচনের তেমন গুরুত্ব নেই, নির্বাচনে মনোনয়ন লাভই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্থানীয় নির্বাচনেও হানাহানি, মারামারি, কেন্দ্র দখল, ইভিএম ভাঙচুর ইত্যাদি মিলে এখন একটা অনিয়মের মডেল তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এসব ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা হলেও অসংখ্য বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা দুর্ঘটনা মিলে এক ধরনের অবিছিন্নতা তৈরি হয়, যা নির্বাচনের অনুষঙ্গ হিসেবে রূপ লাভ করে।’ রাউজানের নির্বাচন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সবচেয়ে চমক সৃষ্টিকারী পৌরসভা নির্বাচন হয়েছে চট্টগ্রামের রাউজানে। বিগত ২৮শে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সেখানে মেয়র ও ১২ জন কাউন্সিলর বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে রাউজান থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকেও তখন তুলে নেয়া হয়েছে। ইতিপূর্বে উপজেলা নির্বাচনেও ঠিক এভাবে রাউজানে সকলেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে এটা ‘নির্বাচন’ না বলে ‘মনোনয়ন’ বলাই সম্ভবত অধিকতর সঙ্গত। সারা দেশে যদি এই মডেলে সবাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধি হতে পারেন, তাহলে নির্বাচনে অনেক আর্থিক সাশ্রয় হয় এবং সহিংসতা ও হানাহানি থেকে রেহাই পাওয়া যায়। এতে নির্বাচন কমিশনের দায়-দায়িত্ব তেমন থাকবে না। এ অবস্থায় নির্বাচন কমিশনের আর প্রয়োজন হবে কি না, সেটা এক বড় প্রশ্ন।’ ইভিএম ভোটের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘একসময়ে আমি বিভিন্ন কারণে ইভিএম বা ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহারের বিরোধী ছিলাম। বিশেষভাবে কোনো প্রস্তুতি ব্যতিরেকে ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতি ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি করেছি। বর্তমানে প্রধানত দু’টি কারণে আমি ইভিএম-এ ভোটগ্রহণে আগ্রহী। প্রথমত, ইভিএম-এ ভোট হলে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয় না। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন কেন্দ্রে শতভাগ ভোট কাস্ট হওয়ার বিড়ম্বনা থেকে আমরা রক্ষা পেতে পারি, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ২১৩টি কেন্দ্রের ফলাফলে আমরা যা দেখেছি। তবে ইভিএম-এ ভোট হলে ভোটারের উপস্থিতি ও ভোটের পরিসংখ্যান আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। বিগত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ভোটের শতকরা হার ছিল যথাক্রমে ২৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ ও ২৯ দশমিক ০৭ শতাংশ। সমপ্রতি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট পড়েছে শতকরা সাড়ে ২২ ভাগ মাত্র। এত কম ভোটে আমরা রাজধানী ঢাকার দু’জন ও চট্টগ্রামের একজন নগরপিতাকে নির্বাচিত করেছি, যার নজির নিতান্ত বিরল।’ ‘ইভিএম ব্যবহার করে আমরা সর্বত্র ভোট জালিয়াতি, কারচুপি, কেন্দ্র দখল ইত্যাদি অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়েছি, এমন দাবি আমি অন্তত করি না। কিন্তু, ইভিএম ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো নিরসন করার উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। নির্বাচন বিষয়ক অনিয়ম ও অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে না নেয়ায় আমরা প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের দায়ে অভিযুক্ত হতে পারি। তবে, ভবিষ্যতে ব্যালট ও ইভিএম উভয় পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ, একই নির্বাচনে দুইটি পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ভোটপ্রদানের শতকরা হারের অনেক তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। এই পার্থক্যের অর্থ ভোটগ্রহণের ফলাফলে বিভেদ সৃষ্টি। ভোটগ্রহণে এ ধরনের বৈষম্য কাম্য নয়।’ নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার না হলে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। আজও এই কথার পুনরাবৃত্তি করতে চাই। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সংস্কার না হলে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। নির্বাচন প্রক্রিয়ার সংস্কার না হলে এখন যে ধরনের নির্বাচন হচ্ছে, তার মান আরও নিম্নগামী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’ ‘জাতীয় ভোটার দিবস উদযাপন একটি গণতান্ত্রিক দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবীন ভোটারদের মধ্যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি এই দিবসটিকে গৌরবান্বিত করেছে। আমি নতুন ভোটারদের আবারও অভিনন্দন জানাই’। যা বললেন সিইসি: প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিইসি কেএম নুরুল হুদা বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে ‘হেয়, অপদস্ত ও নিচে নামানোর জন্য’ যা করা দরকার, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার সবই করে চলেছেন। ‘ব্যক্তিগত স্বার্থে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে’- ইসিকে ‘হেয়’- করে চলেছেন কমিশনের এই সদস্য। তিনি বলেন, মাহবুব তালুকদার সাহেব অভ্যাসগতভাবে সারাজীবন আমাদের এ নির্বাচনে যোগ দেওয়ার পরদিন থেকে যা কিছু ইসি’র নেগেটিভ দিক, তা পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে পাঠ করতেন। আজকে এর ব্যতিক্রম হয়নি। ভোটার দিবস উপলক্ষেও মাহবুব তালুকদার ‘একটি রাজনৈতিক বক্তব্য’- দিয়েছেন বলে মন্তব্য করেন সিইসি। তিনি বলেন, দেশের নির্বাচন কমিশনের স্বার্থে তিনি (মাহবুব তালুকদার) কাজ করেন না; ব্যক্তি স্বার্থে ও একটা উদ্দেশ্য সাধন করার জন্য এ কমিশনকে অপদস্ত করার জন্য যতটুকু যা করা দরকার, যখন যতটুকু করা দরকার, ততটুকু করেছেন উনি। ক্ষোভের সঙ্গে সিইসি বলেন, এ নির্বাচন কমিশনে যোগ দেওয়ার পর যতগুলো সভা হয়েছে, সব সময় মাহবুব তালুকদার ‘একই আচরণ’ করে আসছেন। ‘ভেবেছিলাম ভোটার দিবস হিসেবে তিনি কিছু বলবেন; কিন্তু তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য রাখলেন। ইসিকে কতখানি হেয় করা যায়, কতখানি নিচে নামানো যায়, অপদস্ত করা যায় তা তিনি করে চলেছেন। যেসব নির্বাচনে ভোটের হার বেশি ছিল, সেগুলো মাহবুব তালুকদার তার বক্তব্যে উল্লেখ না করায় পরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি অভিযোগ করেন, ‘নিজের বই লেখার প্রস্তুতির জন্যই’ কমিশনের নানা নেতিবাচক তথ্য সংগ্রহ করে উপস্থাপন করে থাকেন নির্বাচন কমিশনার তালুকদার। আর তা করতে গিয়ে তিনি ‘ভুল তথ্যও উপস্থাপন’ করেন মন্তব্য করে সিইসি নূরুল হুদা বলেন, ‘ইভিএম-এ যে ৮৫% ভোট পড়েছে, তা তিনি (মাহবুব তালুকদার) দেখেননি। যেখানে ৬০%, ৭০% ভোট পড়েছে, তাও তিনি দেখেননি। তা কোনোদিনও তিনি বলবেন না। সিইসি হুদা বলেন, একজন নির্বাচন কমিশনার হিসেবে স্বাধীনভাবে মাহবুব তালুকদার কাজ করতেই পারেন। আর মেয়াদের শেষ বছরে এসেও মাহবুব তালুকদার নিজেকে বদলাবেন বলে তিনি মনে করেন না। তিনি বলেছেন, বলবেন: আর একটা বছর আছে, তা তিনি বলতে থাকবেন, ধরে নিই।... নির্বাচন কমিশনের যেখানে যতটুকু ভুলত্রুটি, একটা পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটেঘুঁটে কোথাও থেকে, ডাস্টবিন থেকে একটা, ওখান থেকে একটা জোড়াতালি দিয়ে ভুলত্রুটি বের করে সম্ভব। ইসিতে তার কী দায়িত্ব, এটা কতটুকু, কী পরামর্শ দিয়েছেন, কাজ করেছেন, সেগুলো করেন কিনা। তা না করে ‘এটা করা যায়নি’, ‘এটা করলে ভালো হতো’, ‘কর্মকর্তারা কাজ কী করছেন’, ‘এগুলো করেন কিনা’, এসব প্রশ্ন করা যায়।” সিইসি বলেন, ‘উনি কথা বলার পরদিন গণমাধ্যমে কেমন কভারেজ পেলেন, কাটিং সংগ্রহ করবেন, ইসি’র পাঁচবছর হবে, ভালো লিখতে পারেন,... উনি বই লিখবেন, এজন্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন।’
পড়া হয়েছে 45 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বুধবার, 03 মার্চ 2021 22:25