08152020শনি
স্পটলাইট

স্পটলাইট (968)

শ্যামল দত্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফেরার পর সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘যে মানুষ মরতে রাজি, তাকে কেউ মারতে পারে না। আপনি একজন মানুষকে হত্যা করতে পারেন। সেটা তো তার দেহ। কিন্তু তার আত্মাকে কি আপনি হত্যা করতে পারেন? না তা কেউ পারে না। এটাই আমার বিশ্বাস।’ একই বছরে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এনবিসি টেলিভিশনের সাংবাদিক পল নিক্সনকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমি পেয়েছি কোটি কোটি মানুষের আস্থা, বিশ্বাস আর ভালোবাসা। যে দিন এই মানুষের জন্যে আমার জীবন দিতে পারবো, সে দিন আমার আশা পূর্ণ হবে, এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করি না।’ এই দুই বিদেশি সাংবাদিককে দেয়া দুটি সাক্ষাৎকার শুনলে মনে হয় দেশের জন্যে, দেশের মানুষের জন্যে জীবন দেয়ার এক চরম আত্মত্যাগের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ১৯৭২ সালে রাষ্ট্র পরিচালনা শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন বাঙালির অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে। সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা যখন অর্জিত হলো, তার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রাণ দিতে হলো তাঁকে। তিনি বিশ্বাস করতেন না, কোনো বাঙালি তাঁকে হত্যা করতে পারে। কিন্তু তিনি জানতেন না, এই বাঙালিদের মধ্যে কারো কারো শরীরে বইছে মীরজাফরের রক্ত। তাই ২৩ বছরের সংগ্রামে অর্জিত স্বাধীন বাংলার মাটিতে তাঁকে জীবন দিতে হলো সেই নব্য মীরজাফরদের হাতে। জাতির পিতার রক্তে রঞ্জিত হলো তাঁরই স্বপ্নের সোনার বাংলা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রচিত হলো সেই বিশ্বাসঘাতকতার কালো ইতিহাস। তাই বাঙালির জীবনের সবচেয়ে এক অন্ধকারতম দিনের নাম ১৫ আগস্ট। এক নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের নাম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা। এক দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মিলিত চক্রান্তের নাম একজন জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রের পরিবর্তন। শুধুমাত্র বাঙালির ইতিহাস নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম জঘন্যতম ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় কোনো নজির নেই। ৩০ লাখ শহীদের জীবনের বিনিময়ে অর্জিত যেই দেশ, সেই যুদ্ধের যে মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাঁকেই হত্যা করা হলো তাঁর নিজের বাসভবনে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে হত্যা করতে সাহস পায়নি, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীরা সেই ১৯৭১ সালের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিল মাত্র সাড়ে চার বছরের মাথায়, তাঁকে হত্যা করে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সুবিধাভোগীরা। রাষ্ট্র চলেছে ১৯৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি ভাবধারায়। জাতির পিতার স্বপ্নের দেশ লুণ্ঠিত হয়েছে এই সুবিধাভোগীদের হাতে। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল- এই দীর্ঘ ২৩ বছর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে জাতির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সুবিধালাভকারীদের দ্বারা। দীর্ঘ এই সময়ে বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়াও নিষিদ্ধ ছিল ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী সুবিধাভোগীরা। রাষ্ট্র চলেছে ১৯৭১ পূর্ববর্তী পাকিস্তানি ভাবধারায়। জাতির পিতার স্বপ্নের দেশ লুণ্ঠিত হয়েছে এই সুবিধাভোগীদের হাতে। বিশ্বাসঘাতক খন্দকার মুশতাক, মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামল এই দীর্ঘ ২৩ বছর বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ শাসিত হয়েছে জাতির পিতাকে হত্যাকাণ্ডের ষড়যন্ত্রকারী ও হত্যাকাণ্ড পরবর্তী সুবিধালাভকারীদের দ্বারা। দীর্ঘ এই সময়ে বঙ্গবন্ধুর নাম নেয়াও নিষিদ্ধ ছিল। ইতিহাস থেকে জাতির পিতার নাম নিশানা মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত নানা অপচেষ্টা করা হয়েছে। কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা হয়েছে। ১৫ আগস্টের বর্বরতম হত্যাকাণ্ডে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু নয়, হত্যা করা হয়- বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেল, শেখ আবু নাসের, সুলতানা কামাল খুকু, পারভীন জামাল রোজী, আবদুর রব সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মনি, বেগম আরজু মনি, কর্নেল জামিলউদ্দিন আহমেদ, আবদুল নঈম খান রিন্টু, বেবী সেরনিয়াবাত, আরিফ সেরনিয়াবাত, শহীদ সেরনিয়াবাত ও সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবুকে। জাতির পিতা থেকে ১০ বছরে শিশু কেউ বাদ যায়নি এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড থেকে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ইতিহাসের মহানায়ক’ গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন, ‘যে নেতার বুকভরা ছিল গভীর ভালোবাসা, বাংলার মানুষ বাংলার আকাশ বাতাস, মাটিকে যিনি গভীর ভালোবাসায় সিক্ত করেছিলেন, সেই বাংলার মাটি তার বুকের রক্তে ভিজে গেল কয়েকজন ঘাতক ও বেইমানের চক্রান্তে।’ বঙ্গবন্ধু কখনো বিশ্বাস করতেন না- এই বাঙালি তাঁকে কখনো হত্যা করতে পারে। তাই দেশের রাষ্ট্রনায়ক হয়েও সাদামাটা নিরাপত্তাহীন এক বাসভবনে তিনি বসবাস করতেন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের এই বাড়িটি এখন বঙ্গবন্ধুর উদার চিন্তা আর ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের কালরাত্রির সাক্ষী হয়ে আছে। এই বাড়ির সিঁড়িতেই লুটিয়ে পড়েছে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত জাতির পিতার লাশ। বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর হওয়া এই বাড়িটি ঘাতকদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন ও নৃশংসতার উদাহরণ হিসেবেই থাকবে আগামী সময়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬- দীর্ঘ ২৩ বছরের নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বাঙালির ইতিহাসের এই মহানায়ককে মানুষের হৃদয় থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা অপচেষ্টাই ছিল মাত্র। যে বাংলার মাটিতে মিশে আছে বঙ্গবন্ধুর প্রাণ, সেই মাটির গন্ধ তো আর বদলে দেয়া সম্ভব নয়। তাই টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে শুয়ে থেকেও তিনি জাগ্রত ছিলেন এবং এখনো আছেন বাঙালির অন্তরের আলো হয়ে। তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের মনে চেতনার বাতিঘর হিসেবে তিনি জাগ্রত আছেন। তাই তিনি থেকেও ছিলেন আলোকবর্তিকার মতো, না থেকেও আছেন বাঙালির হৃদয়জুড়ে। হত্যাকাণ্ডের বিচার: অন্ধকার ভেঙে আলোর পথে যাত্রা ১৯৯৬ সালে ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার করা। জিয়াউর রহমানের শাসনামলের তার পূর্বসুরি খন্দকার মুশতাকের করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে যে সংসদীয় বৈধতা দেয়া হয়েছিল, তা উপড়ে ফেলে বিচারের পথ উন্মুক্ত করা। এই অধ্যাদেশটি জারি হয়েছিল ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে দায়মুক্তি দিয়ে। ১৯৭৯ সালের জেনারেল জিয়ার অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনের পর এই অধ্যাদেশকে আইনের বৈধতা দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর সপ্তম জাতীয় সংসদে ২১ বছর পর এই কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল আইন পাস হয় সংসদে বিচারের পথ উন্মুক্ত হয়। এই বছরের ২ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী মুহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় ২৪ জনকে আসামি করে একটি মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে ১৯৯৮ সালে ৮ নভেম্বর তৎকালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়ে রায় দেন। নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালে ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্ট দ্বিধাবিভক্ত রায় দেয়। ২০০১ সালে ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চ ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে তিনজনকে খালাস দেন। এরপর ১২ আসামির মধ্যে প্রথমে চারজন ও পরে আরেকজন আসামি আপিল করেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘ ছয় বছর আপিল শুনানি না হওয়ার আটকে যায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেয়ায় এই মামলার কার্যক্রম আবার শুরু হয়। ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির লিভ টু আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করে। দীর্ঘ ১ বছর পর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১৯ নভেম্বর ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে চূড়ান্ত রায় দেয় আপিল বিভাগ। ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। এরা হলেন- ১. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, ২. কর্নেল বজলুল হুদা, ৩. ল্যান্সার মহিউদ্দিন আহমেদ, ৪. আর্টিলারি মুহিউদ্দিন ও ৫. সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান। বাকি সাত আসামি সে সময়ে পলাতক ছিল। এ বছরের ১২ এপ্রিল রাজধানীর মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আরেক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল মাজেদের ফাঁসি কার্যকর হয়। এখনো পলাতক ৬ আসামির মধ্যে খন্দকার বজলুর রশিদ ও মেজর শরিফুল হক ডালিম পাকিস্তানে, এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে, এস এইচ এম বি নূর চৌধুরী কানাডায় এবং রিসালদার মোসলেমউদ্দিন ভারতে পলাতক বলে খবর রয়েছে। অন্য এক আসামি আবদুল আজিজ পাশা ২০০১ সালে জিম্বাবুয়েতে মৃত্যুবরণ করেছে বলে জানা যায়। আসল নায়কেরা ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হতে শুরু করে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: ষড়যন্ত্র ছিল দেশে ও বিদেশে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনার পর পুরো জাতি যখন হতচকিত, তখন অনেকেই মনে করতেন এই নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিছকই সেনাবাহিনীর একদল উচ্চাভিলাষী জুনিয়র ও মধ্যম স্তরের সেনাসদস্যের কাজ। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপর ক্ষমতাগ্রহণকারী খুনি মুশতাক চক্র এভাবেই একটি ধারণা দেয়ার অপচেষ্টাই করছিলেন অত্যন্ত সুচতুরভাবে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সেনা নেতৃত্বের কোনো যোগসাজশ নেই, কোনো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিষয় এটা ছিল না- নিজেদের দায় এড়ানো ও আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে সামলানোর লক্ষ্য নিয়ে এই প্রচারণা চালানো হয়েছিল সুকৌশলে। বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিভ্রান্ত করা, দেশের মধ্যে যাতে কোনো জনপ্রতিরোধ গড়ে না ওঠে- তা মোকাবিলা করা, সর্বোপরি ষড়যন্ত্রের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রকে আড়াল করার উদ্দেশ্যেই অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে এটা করা হয়েছিল। পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডে জড়িত সেনা কর্মকর্তারা পরবর্তী নানা ঘটে যাওয়া ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে আসল নায়কেরা ক্ষমতার মঞ্চে আবির্ভূত হতে শুরু করে। ক্ষমতার বলয় থেকে ছিটকে পড়ে হত্যাকারীরা যারা এতদিন ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে বঙ্গভবন থেকে পুরো দেশ নিয়ন্ত্রণ করছিল। এরপর অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থানে খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আসল নায়কেরা। ক্ষমতা কেন্দ্রে তখন চলে আসে জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদ গং। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত দেশীয় চক্রান্তকারীদের গ্রুপটিও তখন কোণঠাসা হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক চক্রান্তকারীদের মূল লক্ষ্য অর্জিত হওয়ায় তারা নিজেরাই চলে যায় আড়ালে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম সত্য হচ্ছে, ইতিহাস চাপা থাকে না। সত্য উন্মোচিত হয় মিথ্যার আড়াল থেকে। এক মনীষী বলেছিলেন, তিনটি জিনিসকে কখনো চাপা দিয়ে রাখা যায় না। এই তিন জিনিস হলো- চন্দ্র, সূর্য এবং সত্য। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া, গবেষণা ও নানা লেখালেখিতে উন্মোচিত হতে থাকে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের ভয়ঙ্কর বিভিন্ন দিক। দেশি ও বিদেশি লেখক, গবেষক ও সাংবাদিকরা এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ কথা সত্য যে, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ষড়যন্ত্রের পথেই চলে। চলতে চলতে খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসে আসল চক্র, উন্মোচিত হয় প্রকৃত ঘটনা। ঘটনার পরম্পরা বিশ্লেষণ করে গভীর অনুসন্ধান করলেই বেরিয়ে আসে আসল সত্য। সেই ইতিহাসের অমোঘ সত্যের বিশ্লেষিত জায়গাগুলো এখন তুলে ধরতে চাই। যার ঘটনা পরস্পর বিশ্লেষণ বঙ্গবন্ধু হত্যার ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের অন্ধকার দিকটিকে আলোতে নিয়ে আসে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: যুক্তরাষ্ট্রের নীরব সমর্থন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত মুজিবনগর সরকারের সময় খন্দকার মুশতাক চক্র কলকাতার মার্কিন কনসুলেটের মাধ্যমে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। স্বাধীন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু তখন থেকেই। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা যখন লড়াইয়ে লিপ্ত, অসংখ্য মানুষের রক্তে যখন রঞ্জিত বাংলার মাটি, মুক্তিকামী মানুষ পাকিস্তানি বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রবাসী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মুশতাক আহমেদ, পররাষ্ট্র সচিব মাহবুল আলম চাষী, মুশতাকের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা কুমিল্লার এমপি জহুরুল কাইয়ুম ও তাহেরউদ্দিন ঠাকুর কলকাতায় মার্কিন কনসাল জোসেফ ফারল্যান্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ ঠেকাতে কনফেডারেশনের প্রস্তাব নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। তাদের এই তৎপরতা ভারতের গোয়েন্দাদের নজরে আসার পর তাজউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন মুজিবনগর সরকারে তাদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। ইতিহাসের নির্মম সত্য হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার এই চক্রান্তের নায়কেরা ১৫ আগস্ট সকালেই সশরীরে উপস্থিত শাহবাগ রেডিও স্টেশনে। বঙ্গবন্ধু সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মুশতাক আহমেদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী তাহেরউদ্দিন ঠাকুর, কুমিল্লার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির মহাপরিচালক মাহবুল আলম চাষী উপস্থিত খুনি চক্রের সাথে। ১৯৭১ সালে তারা যেটা করতে সফল হয়নি, ১৯৭৫ সালে সফল হয় বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তারপরের ইতিহাস সবার জানা। মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজ ও সাংবাদিক কাই বার্ড অনুসন্ধান করে দেখিয়েছিলেন, এই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রক্রিয়ায় কীভাবে ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজিন বোস্টার ও সিআইএর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি জড়িত ছিলেন। ১৯৯৯ সালে নিউইয়র্কের ডেইলি মেইল পত্রিকায় এই দুই মার্কিন সাংবাদিকের লেখা ‘বাংলাদেশ, এনাটমি অব এ ক্যু’ প্রবন্ধে বিস্তারিত তার বিবরণ আছে। ১৯৭৫ সালে জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারী ফারুক রশীদ গং মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের বলা হয়, তারা যদি তাদের অভিযানে সফল হয়, তাহলে সমর্থন দেবে। আর ব্যর্থ হলে তারা পুরো বিষয়টাই অস্বীকার করবে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: যুক্তরাষ্ট্রের নীবর সমর্থন আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টেফার হিছেন তার গবেষণামূলক গ্রন্থ- ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ গ্রন্থে তথ্য প্রমাণ দিয়ে লিখেছেন, বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের প্রক্রিয়ায় তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন তথা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের সম্মতি ছিল। হেনরি কিসিঞ্জার ১৯৭৩ সালে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৯৭১ সালেই হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের সামরিক জান্তার জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে আশ্বস্ত করেন যে, ভারতে মুজিবনগর সরকারের একটি অংশ স্বাধীনতার দাবি পরিত্যাগ করে সমঝোতা করতে আগ্রহী। কয়েক বছর আগে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের যে গোপন দলিল উন্মুক্ত করে দেয়া হয়, তাতে দেখা যায়, ১৯৭১ সালের ১১ আগস্ট হোয়াইট হাউসে নিক্সন, কিসিঞ্জার ও অন্যদের এক বৈঠকে তৎকালীন মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট জন আরউইনের দেয়া এক রিপোর্টে খন্দকার মুশতাকের সঙ্গে ভারতের মার্কিন দূতাবাসের রাজনৈতিক কর্মকর্তা জর্জ গ্রিফিনের এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মুশতাকের এই আলোচনার কথা তার উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরীকে জানান। বাংলাদেশের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর স্বামী জি ডব্লিউ চৌধুরী বা গোলাম ওয়াদুদ চৌধুরী তার লেখা বই ‘দ্যা লাস্ট ডেইজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান’ গ্রন্থে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে যুদ্ধ ছাড়াই সমাধান হবে বলে মার্কিন প্রশাসনের আশ্বস্ত করার খবর উল্লেখ করেন। সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালে খন্দকার মুশতাকের নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিদলের যুক্তরাষ্ট্র সফর করার কথা ছিল। এবং নিউইয়র্কে খন্দকার মুশতাকের সঙ্গে মার্কিন ও পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের ত্রিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে মুশতাকের এই চক্রান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন প্রতিনিধিদলে পরিবর্তন আনেন। খন্দকার মুশতাকের পরিবর্তে পরবর্তী সময়ে লন্ডন থেকে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ভিন্ন একটি প্রতিনিধিদলকে নিউইয়র্কে পাঠানো হয়। এরপর থেকে খন্দকার মুশতাককে মুজিবনগর সরকারে একেবারে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়। অন্যদিকে মার্কিন কংগ্রেসম্যান স্টিফেন জে সোলার্জ ১৯৮০ সালের ৩ জুন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুলজকে লেখা এক চিঠিতে জানান, হাউস ফরেন এফেয়ার্স কমিটির এক তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শাসনামলের বিরোধিতাকারীরা ১৯৭৪ সালের নভেম্বর ও ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। লরেন্স লিফসুলজ লিখেছেন, ঢাকায় বাংলাদেশি সামরিক কর্মকর্তাদের দুটি গ্রুপ- জুনিয়র অফিসার যারা হত্যাকাণ্ড ঘটাবে অন্যদিকে জিয়াউর রহমানের মতো সিনিয়র অফিসার গ্রুপ যারা ভবিষ্যতে নেতৃত্ব নেবে- উভয় গ্রুপই মার্কিন দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। দূতাবাস থেকে বলা হয়, মুজিবকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিলে তাদের কোনো সমস্যা নেই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড: পাকিস্তানের ভূমিকা আন্তর্জাতিক চাপে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান কারাগারকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেও পাকিস্তান মনেপ্রাণে কখনো বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে পারেনি। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন, কনফেডারেশন জাতীয় কিছু একটা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ঠেকানো যায় কিনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কোনোভাবেই এ ধরনের কোনো উদ্যোগে রাজি করানো যায়নি। ঢাকায় রেসকোর্সে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মিত্রবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরা ও পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান সেনা কমান্ডার জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর মধ্যে পরাজয়ের দলিল স্বাক্ষরের পরও এই চেষ্টা অব্যাহত ছিল। এমনকি ১৯৭৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, তাতে বাংলাদেশকে পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে উল্লেখ করে একদিন দখলমুক্ত হয়ে আবার পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের পর বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার জন্যে পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ ছিল চরমে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতিসংঘ ও সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য মিত্র দেশ দিয়ে এই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন, যাতে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী শেষ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মতো হটকারী সিদ্ধান্ত না নেয়। অনেকের মতে, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী বাংলাদেশের নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যা করলেও পাকিস্তানদের হাতে আটক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করার দুটি কারণ ছিল। এক. বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতার সমস্ত সম্ভাবনা তখনই শেষ হয়ে যাবে। দুই. মার্কিন প্রশাসন পাকিস্তানকে আশ্বস্ত করেছিল, খন্দকার মুশতাক গং-এর সঙ্গে মুক্তির সংগ্রাম বাদ দিয়ে যুদ্ধবিরতির যে আলোচনা তারা চালাচ্ছিলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলে সেই চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবেশিত হবে। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্টো কিংবা মার্কিন এ শাসকদের এই দুই প্রচেষ্টার কোনোটাই সফল হয়নি বঙ্গবন্ধুর অনঢ় ভূমিকা ও মার্কিন-মুশতাক ষড়যন্ত্র ফাঁস হয়ে যাওয়ায়। জেনারেল ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার পূর্ব মুহূর্তে বলেছিলেন, তাঁর জীবনের বড় ভুল ছিল, শেখ মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখা। ৮ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুকে ৪ জানুয়ারি থেকে মিলাওয়ানওয়াল জেল থেকে মুক্ত করে রাওয়ালপিন্ডির একটি গেস্ট হাউসে আনা হয়। এখানে আগে থেকে অবস্থান করেছিলেন ড. কামাল হোসেন। ড. কামাল হোসেন তার বইয়ে লিখেছেন, এই চার দিনে জুলফিকার আলী ভুট্টো কয়েক দফা চেষ্টা করেছেন বঙ্গবন্ধুকে দিয়ে যে কোনোভাবে দুই পাকিস্তানের এক সঙ্গে থাকার একটি যৌথ ঘোষণা দেয়া যায় কিনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কোনোভাবে এ ধরনের ঘোষণায় সম্মত করানো সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমি নয় মাস পাকিস্তানে বন্দি, আমি কিছুই জানি না বাংলাদেশে কী ঘটেছে। আমাকে বাংলাদেশে যেতে হবে, আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তারপর এ বিষয়ে কথা বলতে পারব। এর মধ্যে ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে নেয়ার জন্য ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্সের বিশেষ বিমান এসে উপস্থিত হওয়ায় পাকিস্তানিরা হাল ছেড়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। আন্তর্জাতিক চাপে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তান কারাগারকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেও পাকিস্তান মনেপ্রাণে কখনো বাংলাদেশের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে পারেনি। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন, কনফেডারেশন জাতীয় কিছু একটা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ঠেকানো যায় কিনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কোনোভাবেই এ ধরনের কোনো উদ্যোগে রাজি করানো যায়নি ৮ জানুয়ারি অপরাহ্নে লন্ডন পৌঁছে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েও একই কথা বলেন। ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে রেসকোর্স ময়দানে যে বক্তৃতা দেন, তাতে এ বিষয়ে আলোচনার দরজা চিরতরে বন্ধ করেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেন, ভুট্টো দু’দেশের মধ্যে একটি শিথিল সম্পর্ক রাখার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন। আমি বলেছিলাম, এ ব্যাপারে আমি এখন কিছু বলতে পারব না। এখন আমি বলতে চাই, আপনি আপনার দেশ নিয়ে শান্তিতে থাকুন, বাংলাদেশ এখন স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এখন যদি কেউ বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করতে চায়, তাহলে সে স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্যে মুজিব সর্বপ্রথম তাঁর প্রাণ দেবে। ইতিহাসের নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তান-মার্কিন ও দেশীয় দোসরদের চক্রান্তে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রথম অভিনন্দনটি আসে পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছ থেকে। বাংলাদেশকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করার অভিনন্দন জানিয়ে ভুট্টো ইসলামী সংস্থায় সব সদস্য এবং তৃতীয় বিশ্বের সব দেশের প্রতি অনুরূপ আহ্বান জানান। তিনি শুভেচ্ছা হিসেবে ‘বাংলাদেশি মুসলমান ভাইদের’ জন্য ৫০ হাজার টন চাল ও ১০ মিলিয়ন গজ কাপড় পাঠানোর সিদ্ধান্তও দেন। ভুট্টোর এই পদক্ষেপ কি নিছক কূটনৈতিক কার্যক্রম না একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ- তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ আছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন বাংলাদেশে ঘটল- তাতে ভুট্টো যে শুধুমাত্র নীরব দর্শক ছিলেন না, ১৫ আগস্টের পূর্বাপর ঘটনা তাই প্রমাণ করে। কারণ ১৯৭৫ সালে ১৮ এপ্রিল কাকুলে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে দেয়া এক ভাষণে তিনি বলেছেন, শিগগির এই অঞ্চলে কিছু বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। ১৯৭৪ সালে জুন মাসে ১০৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল ভুট্টোর বাংলাদেশ সফরের পর তার সফরসঙ্গী এক সাংবাদিক দেশে ফিরে গিয়ে করাচির ডেইলি নিউজ পত্রিকায় বাংলাদেশে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনার কথা লেখেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞ দায়রা জজ থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত মামলা দায়ের ও রায় চূড়ান্ত হওয়ার বিভিন্ন আদালতে মোট ৪টি রায় প্রদান করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে মামলা দায়ের থেকে ২০১০ সালে ফাঁসি কার্যকর পর্যন্ত এই রায়গুলো দিয়েছেন ঢাকা জেলার দায়রা জজ বিচারক কাজী গোলাম রসুল, সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির বিভক্তির রায় দিয়েছেন বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন ও বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, পরবর্তীকালে তৃতীয় একক বেঞ্চ বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিমের বেঞ্চের রায় এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি তাফাজ্জল ইসলামের নেতৃত্বে ৫ জন বিচারপতির অভিন্ন ও চূড়ান্ত রায়। প্রতিটি রায়ের পর্যবেক্ষণ অংশে সপরিবারে দেশের রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনা শুধুমাত্র একটি নিছক হত্যাকাণ্ড ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়। এই হত্যাকারীদের বিচারের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য নায়ক ও ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উন্মোচনের জন্যেও মতামত দেয়া হয়। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দিকটি বিবেচ্য ছিল না বিধায় এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যের সুবিধাভোগী ও ষড়যন্ত্রের নেপথ্যের কুশীলবরা বরাবরের মতো আড়ালেই থেকে গেছে। বিচারকদের পর্যবেক্ষণে পৃথক ও সঠিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি উন্মোচনের আহ্বানও জানানো হয়। হত্যা, ক্যু ও অসাংবিধানিক পথে ক্ষমতা দখলের পথ চিরতরে বন্ধ করতে হলে ষড়যন্ত্রের কানাগলিতে ঘুরতে আগ্রহীদের মুখোশ উন্মোচিত হওয়া প্রয়োজন। তাই আজ দাবি উঠেছে, পৃথক একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা, জাতীয় ৪ নেতাকে জেলখানার ভেতরে হত্যার তদন্তের জন্য এক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠন করা এবং কেন্দ্রীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের বিচারের মুখোমুখি করা। অন্যথায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে তার কয়েকজন হত্যাকারীর বিচার হলেও ষড়যন্ত্রের দিকটি উন্মোচিত না হলে তাঁর রক্তের ঋণ আমরা কখনো শোধ করতে পারবো না। শেষ করব ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিছেনের লেখা ‘দ্য ট্রায়াল অব হেনরি কিসিঞ্জার’ গ্রন্থের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। হিছেন লিখেছেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত গণহত্যায় প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনায় পরোক্ষ সম্মতি দিয়ে যে ঘৃণ্য অপরাধ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার করেছেন, তার যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে এবং এই প্রমাণ দিয়েই কিসিঞ্জারকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো সম্ভব। একজন বিদেশি সাংবাদিক যদি এই দাবি তুলতে পারেন, তাহলে আমরা বাংলাদেশিরা কেন এই দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করে তাদের আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর দাবি তুলব না? শ্যামল দত্ত, সম্পাদক, ভোরেরকাগজ।
॥ এ কে এম কামাল উদ্দিন চৌধুরী ॥ যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হিসেবে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে জনগণকে একটি মর্যাদাপূর্ণ জীবন যাপনে সক্ষমতা দানের জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ক্ষতিগ্রস্থ যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে সফলভাবে একটি রাষ্ট্র বিনির্মান কৌশল গ্রহন করেছিলেন। ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি বাস্তবায়নের একটি দীর্ঘ মেয়াদী অর্থনৈতিক প্রয়াসের পরিকল্পনা গ্রহন করেন। পাকিস্তানে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফেরার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অর্থনীতি পুনর্গঠন ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি এক্ষেত্রে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগান। দুর্দশাগ্রস্ত মানুষকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দিতে একটি ক্ষুধা ও দরিদ্রমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন নিয়ে বঙ্গবন্ধু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদনের উপর প্রাধান্য দেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরনিকায় জুলিয়ান ফ্রান্সিস তার ‘থিংকিং অ্যাবাউট অ্যান্ড রিমেম্বারিং বঙ্গবন্ধু’ আর্টিকেলে লিখেন ‘তখন খাদ্য উৎপাদন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সংস্কার করাই ছিল সবচেয়ে জরুরি। এই দুটির প্রয়োজনীয়তা ছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ দেশের বিভিন্ন স্থানে খাদ্য সরবরাহে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছিল অপরিহার্য। এটা লক্ষণীয় যে বঙ্গবন্ধু প্রশাসন শরণার্থীদের খুবই সুশৃঙ্খলভাবে দেশে ফিরিয়ে আনে।’ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় কমিটি এই স্মারক গ্রন্থটি প্রকাশ করে। সুনামধন্য ব্রিটিশ এনজিও অক্সফাম এর সাবেক কর্মকর্তা জুলিয়ান ফ্রান্সিস ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানী হানাদারদের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে ভারতে আশ্রয় গ্রহনকারী বাংলাদেশী শরণার্থীদের মাঝে কাজ করেন। তিনি বলেন, তিনি ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নির্মম বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে অবগত। তিনি আরো বলেন, ‘পরে ভারতীয় সীমান্ত এলাকায় শরণার্থী শিবিরগুলোতে আমি অক্সফামের ব্যাপক ত্রাণ কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলাম। সেই সময়ে ৬ লাখ বাংলাদেশী নারী, পুরুষ ও শিশুকে ত্রাণ দেয়া হচ্ছিল।’ ফ্রান্সিস বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি বাংলাদেশে আসেন এবং বঙ্গবন্ধুর সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করেন। ১৯৭১ সালে ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ এ সময় বঙ্গবন্ধুর সাথে ফ্রান্সিসের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন যে, অক্সফামের মতো ছোট সংগঠন বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে কি ধরনের সাহায্য করতে পারে সে সম্পর্কে তিনি বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ চান। ফ্রান্সিস বলেন, তখন বঙ্গবন্ধু তাঁর মুখ থেকে পাইপ সরিয়ে আমার দিকে ধোঁয়া ছেড়ে বলেন, ‘হে যুবক আপনি কিভাবে এখানে এলেন?’ আমি তাঁকে বললাম যে, আমি কোলকাতা থেকে সড়কপথে এখানে এসেছি। তখন তিনি বললেন, ‘আপনি তাহলে আমার চেয়ে বেশি এই দেশকে দেখেছেন। কারণ নয় মাস আমি কারাগারে আটক ছিলাম। তাই দয়া করে আপনিই আমাকে বলুন আমার দেশের কি প্রয়োজন? আপনি কি দেখলেন?’ ফ্রান্সিস বলেন, বঙ্গবন্ধুর সাথে ওই বৈঠকের পর অক্সফাম তিনটি ট্রাকবাহী ফেরি সংগ্রহ করে নিয়ে এলো এবং আরো অনেকগুলো মেরামতে সহায়তা করল। আর্টিকেলটিতে জুলিয়ান ফ্রান্সিস আরো উল্লেখ করেন যে, ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমার ভাইয়েরা, আপনারা জানেন যে আপনাদের অনেক কাজ করতে হবে। আমি চাই আমার সব মানুষ ভেঙ্গে পড়া পথঘাট সংস্কারে কাজ শুরু করুক। আমি চাই আপনারা সবাই ধান চাষ করতে ক্ষেতে ফিরে যান। আমি বলতে চাই, একজন কর্মচারীও যেন ঘুষ না খায়। মনে রাখবেন, ঘুষখোরদের আমি কখনোই ক্ষমা করব না।’ তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের জানুয়ারি বা ফেব্রুয়ারি মাসে সরকারি সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, তাদেরকে দেশ ও জনগণের সেবায় উৎসর্গ করতে হবে। ফ্রান্সিস বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, তারা জনগণের সেবক, মালিক নয়। তিনি তাদেরকে এয়ার কন্ডিশনার, কার্পেট ও বিলাসজাত কোন জিনিস না কেনার নির্দেশ দেন।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, দেশের প্রথম জাতীয় বাজেটেও কৃষি, শিক্ষা এবং মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধে যেসব নারী, শিশু ও অন্যান্যরা বাড়িঘর হারিয়েছে তাদের জন্য বাড়িঘর নির্মাণসহ সমাজ কল্যাণমূলক কার্যক্রমের উপর প্রাধান্য দেয়া হয়। তিনি আরো বলেন, দারিদ্র দূরীকরণ ও সকলের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থান নিশ্চিতের লক্ষে বঙ্গবন্ধু দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। আতিউর বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু সব সময়ই গরিবদের জন্য কাজ করতেন। এমনকি শিশুকাল থেকেই তার বাবার গোলার শস্য তাঁর গরিব প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন।’ তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধু কর্মসংস্থার সৃষ্টির লক্ষ্যে ও আয়-বৈষম্য হ্রাসের জন্য কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এসএমইএস এবং কুটির শিল্পের উপর গুরুত্ব দিতেন। আতিউর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার মানুষকে পুনরায় যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে কিছু বড় সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও টেলিফোন এক্সচেঞ্জ মেরামত শুরু করে। এগুলো দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি আরো বলেন, পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, তিস্তা রেল সেতু ও ভৈরব রেল সেতুর সংস্কার করা হয় এবং যান চলাচলের জন্য এগুলোকে খুলে দেয়া হয়। এছাড়াও মাইন ও জাহাজের ধ্বংসস্তুপ অপসারণ করে চট্টগ্রাম বন্দরও পুনরায় খুলে দেয়া হয়। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের ত্রাণ পরিচালনা দল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের পর এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশ একটি সুশৃঙ্খল দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণেই এমনটি সম্ভব হয়েছে। প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছিল, মার্কিন দূতাবাস থেকেও বলা হয় যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী (বঙ্গবন্ধু) সবকিছু তাঁর নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। তিনি সুশৃঙ্খল উপায়ে তাঁর প্রশাসনকে সাজাতে পেরেছেন। অনেকেই ভাবতে পারেনি যে, এক বছর আগেও বাংলাদেশের অস্তিত্ব ছিল না।
নিউজফ্ল্যাশ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী হিসেবে নয় একজন নীরব দক্ষ সংগঠক হিসেবে যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয় সমআসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তিনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিনী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে শনিরবার রাতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে আয়োজিত হয় ‘গৃহকোণ থেকে জনগণের হৃদয়ে’ শীর্ষক বিশেষ ওয়েবিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। সাবেক ছাত্র নেতা ও কলামিস্ট সুভাষ সিংহ রায়ের সঞ্চালনায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগে উপদেষ্টাপরিষদের সদস্য আমীর হোসেন আমু, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক মেহের আফরোজ চুমকি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও কবি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন সিনিয়র সাংবাদিক অজয় দাশগুপ্ত। আমির হোসেন আমু আলোচনার শুরুতে বঙ্গমাতাকে বঙ্গবন্ধুর সহযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেন এবং ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধুসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নিহত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে শোক ও শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর কোন পিছুটান ছিলো না বলেই বঙ্গবন্ধু দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করে যেতে পেরেছিলেন, আর বঙ্গবন্ধুর এই চলার পথকে মসৃন করেছিলেন তাঁর স্ত্রী বঙ্গমাতা শেখ মুজিব। তিনি বলেন, বেগম মুজিবের মধ্যে কিছু ঐশ্বরিক ক্ষমতা থাকতে পারে নয়ত যে বয়সে ছেলেমেয়েদের বাবা-মার কাছে আবদার থাকে সেবয়সেও বেগম মুজিব বায়না না করে বঙ্গবন্ধুর হাতে তার জমানো টাকা তুলে দিতেন যাতে বঙ্গবন্ধুর কলকাতাতে কষ্ট না হয়। এই যে তার ত্যাগ, সেই ত্যাগের বিনিময়েই বঙ্গবন্ধুর কিন্তু বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠা। বঙ্গবন্ধুর জীবনে সবচেয়ে বড় আশির্বাদ হিসেবে বেগম মুজিব এসেছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে যেভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন, মূল্যায়ন করেছিলেন তা তার লেখনির মাধ্যমে প্রমানিত হয়েছে। বঙ্গমাতার সাথে তার নিজের অনেক ঘটনার উল্লেখ করে আমু বলেন, আমরা যারা ছাত্র রাজনীতি করতাম আমরা সবচেয়ে বেশি তার সান্নিধ্য পেয়েছি, বঙ্গবন্ধু কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি আমাদের সাহস যুগিয়েছেন, পরামর্শ দিয়েছেন, আর্থিক সাহায়তা দিয়েছেন। এমনকি ঈদ করার টাকাও আমাদের দিয়েছেন ছাত্র আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য। তার জমানো টাকা পরিবারের পিছনে খরচ না করে আমাদের মত ছাত্রনেতাদের দিতেন আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে নেয়ার জন্য। মেহের আফরোজ চুমকি আলোচনার শুরুতে ১৫ আগষ্টের নীহত শহীদদের কথা স্বরণ করে বলেন, আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো বঙ্গমাতাকে দেখার, বাবার সাথে ৩২ নাম্বার বাড়ি গিয়েছিলাম একবার। তাকে দেখে আমি অবাক হয়েছিলাম, এত বড় একজন মানুষের স্ত্রী এত সাধারণ হবে আমার ধারনাই ছিলো না। পরবর্তীতে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার কাছ থেকে বঙ্গমাতাকে নিয়ে আমার জানার আরো সুযোগ হয়, তার মধ্যে আদর্শ ছিলো, মানবতা ছিলো, দেশপ্রেম ছিলো বলেই বঙ্গবন্ধুর চলার পথে কখনও বাধা হননি তিনি, বরং হয়েছেন চলার পথের শক্তি, হয়েছেন প্রেরণা। সিনিয়র সাংবাদিক অজয় দাস গুপ্ত মূল প্রবন্ধ উপস্থানের সময় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সম্পর্কে নানা জানা-অজানা কথা তুলে ধরেন। তিনি তার প্রবন্ধে, বঙ্গমাতাকে একজন শান্ত ধীরস্থির ধৈর্যশীল সাহসী প্রজ্ঞাবান তেজস্বিনী এবং অমায়িক হিসেবে উল্লেখ করেন। দেশের জন্য তিনি তার দুই সন্তানকে মাতৃভূমি স্বাধীন করার লড়াইয়ে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর কারা জীবনে শতবার দেখা করতে যাওয়ার ঘটনাও প্রবন্ধে উল্লেখ করেন এই সাংবাদিক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও কবি অধ্যাপক ডঃ মুহাম্মদ সামাদ বলেন, পৃথিবীতে কিছু মহিয়সি নারী আছেন যারা একজন মহামানবকে তৈরি করতে সাহায্য করেছিলেন আমাদের বঙ্গমাতা বেগম মুজিব তাদের মধ্যে একজন। বঙ্গবন্ধুর যে তিন খন্ড আত্মজীবনী বের হয়েছে, সেগুলো লিখতে অনুপ্রেরনা দিয়েছিলেন বঙ্গমাতা। ছয় দফা, গনঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরনা হয়ে কাজ করেছেন বঙ্গমাতা মুজিব বলেও উল্লেখ করেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ডঃ নাসরীন আহমদ বলেন, আমরা প্রতিবেশি ছিলাম, দুই বাড়ির মাঝে ছোট একটা দেয়াল, একটা ছোট গেইট। সেই গেইট দিয়ে আমাদের অবাদ যাতায়াত ছিলো। তাদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন থেকে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের অবাদ যাতায়াত ছিলো, আর এসব সামলাতেন বঙ্গমাতা শেখ মুজিব। আমরা তাকে কখনও কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করতে দেখিনি, দেখিনি তাকে উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে। নিজের বিয়ের সময় হলুদের অনুষ্ঠানে বঙ্গমাতার উপস্থিতি ও আনন্দময় পরিবেশ তৈরি নিয়েও স্মৃতিচারন করেন তিনি। আলোচকরা অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জীবনে ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ভূমিকা, বঙ্গবন্ধু জেলে থাকা অবস্থায় বেগম মুজিবের দলকে সুসংগঠিত করা ছাড়াও বঙ্গমাতার অনেক অজানা বিষয় সম্পর্কেও আলোকপাত করেন।
শুক্রবার, 07 আগস্ট 2020 16:15

বঙ্গমাতার ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ

লিখেছেন
নিউজফ্ল্যাশ প্রতিবেদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে তিনি জাতির পিতার হত্যাকারীদের হাতে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করেন। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের জন্মবার্ষিকী জাতীয়ভাবে উদযাপনের লক্ষ্যে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘বঙ্গমাতা ত্যাগ ও সুন্দরের সাহসী প্রতীক’। বাংলাদেশ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতি করবেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করবেন। জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী। বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকীতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের আর্থিক সাহায্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে দুঃস্থ নারীদের সেলাই মেশিন ও মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে নগদ অর্থ প্রদান করা হবে। সকল জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত সুবিধাভোগীদের তালিকা অনুযায়ী ৬৪ জেলায় তিন হাজার দুইশত সেলাই মেশিন ও তেরশ জন দুঃস্থ ও অসহায় নারীদের মধ্যে দুই হাজার টাকা করে মোট ছাব্বিশ লাখ টাকা প্রদান করা হবে। একই সাথে গোপালগঞ্জ জেলার দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে একশত ল্যাপটপ বিতরণ করা হবে। গোপালগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আর্থিক অনুদান গ্রহণের জন্য ৫ জন, সেলাই মেশিন গ্রহণের জন্য ৫ জন এবং ল্যাপটপ গ্রহণের জন্য ৫ জন নির্বাচিত সুবিধাভোগী উপস্থিত থাকবেন। আর্থিক অনুদানের অর্থ ইলেক্ট্রনিক পদ্ধতিতে প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত সুবিধাভোগীদের মোবাইল নম্বরে হস্তান্তর করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে গোপালগঞ্জের জেলা প্রশাসক উপস্থিত সুবিধাভোগীদের মধ্যে সেলাই মেশিন এবং ল্যাপটপ হস্তান্তর করবেন। সারা দেশে জেলা প্রশাসকদের সাথে সমন্বয় করে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর-সংস্থা বঙ্গমাতার জন্মবার্ষিকী উদযাপনে আলোচনা সভার আয়োজন করবে। এছাড়াও মহীয়সী নারী বঙ্গমাতার গৌরবময় কর্মজীবনের উপর প্রামাণ্যচিত্র নির্মান ও স্মরণিকা প্রকাশ করা হবে। দিবসটি উপলক্ষে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ অন্যান্য ইলেকট্রনিক মিডিয়া বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করবে। এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সকাল ১০ টায় বনানী কবরস্থানে শহীদ ফজিলাতুন্নেসার সমাধিতে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ শেষে কোরানখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ সহযোগী সংগঠনগুলো এই কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করবে। এছাড়া যুব মহিলা লীগ ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে মোমবাতি প্রজ্জলন এর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইতিহাসে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব কেবল একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মিণীই নন, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে অন্যতম এক নেপথ্য অনুপ্রেরণাদাত্রী। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে তিনি বঙ্গবন্ধুকে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন। ছায়ার মত অনুসরণ করেছেন প্রাণপ্রিয় স্বামী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে। এই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য অবদান রেখেছেন। জীবনে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছেন, এজন্য অনেক কষ্ট-দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে তাকে। বঙ্গমাতার জন্মদিন উপলক্ষে শনিবার বেলা ১২ টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বাংলাদেশ কৃষক লীগ আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং তথ্য মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের জন্মবার্ষিকী যথাযথ মর্যাদায় পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ, সহযোগী সংগঠনের সকল স্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশেষ প্রতিনিধি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শেখ কামাল বেঁচে থাকলে দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতো। সে তার বহুমুখী প্রতিভা দিয়ে দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াঙ্গনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ যদি কামাল (শেখ কামাল) বেঁচে থাকতো তবে, সে দেশকে অনেক কিছু দিতে পারতো। তার বহুমুখী প্রতিভা দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারতো। কামাল অনেক ক্ষেত্রেই তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছে।’ আজ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহীদ শেখ কামালের ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। শেখ কামালের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ভবনে এই আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কামালের বহুমুখী প্রতিভা ছিল। একজনের মধ্যে এতো গুণ ও প্রতিভার সমাহার সত্যিই বিরল।’ তিনি আরো বলেন, কামাল একদিকে যেমন ছিল একজন ক্রীড়া সংগঠক, ঠিক তেমনি অপর দিকে সংস্কৃতিক অঙ্গনেও ছিল তার বহুমুখী প্রতিভা। পাশাপাশি, রাজনীতিতেও সে দক্ষতা ও যোগ্যতার ছাপ রেখে গেছে। রাজনীতি ও আন্দোলনে শেখ কামালের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছয় দফা দাবির সময় থেকে প্রতিটি সংগ্রাম ও আন্দোলনে কামাল সক্রিয় ছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জাতির পিতা গ্রেফতার হলে কামাল সে সময় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।’ তিনি বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ শেষে মহান মুক্তিযুদ্ধে কামাল সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। ক্রীড়াঙ্গনে শেখ কামালের অবদান সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধানমন্ডিতে খেলাধূলার আয়োজন এবং আবাহনী ক্লাব প্রতিষ্ঠা ক্রীড়াঙ্গনে কামালের সবচেয়ে বড় অবদান। মুক্তিযুদ্ধের পর কামাল আবাহনীকে আরো শক্তিশালী করে। আবাহনীর জন্য কামালের গভীর ভালবাসা ছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে জার্মানী যাওয়ার আগে কামাল তাঁর কাছে তার ক্লাবের ফুটবল খেলোয়াড়দের জন্য অ্যাডিডাস বুটস আনতে বলেছিল। শেখ কামালের বড় বোন শেখ হাসিনা এ সময় বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, কামাল তার নিজের জন্য কখনোই কিছু চায়নি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কামাল গান গাইতো ও সেতার বাজাতো। সে স্পন্দন শিল্প গোষ্ঠী’ নামে একটি সঙ্গীতের ব্যান্ড দলও গঠন করে। পাশাপাশি, কামাল ঢাকা থিয়েটার প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখে যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি আরো বলেন, ‘কামাল আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার হাতে গড়া আবাহনী ও স্পন্দন এখনো আছে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘কামাল আমার দুই বছরের ছোট ছিল। কিন্তু সে অনেক পরিপক্ক ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন ছিল। পাশাপাশি তার আরো অনেক গুণ ছিল। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই কামালের দায়িত্ববোধ ছিল। ছোটবেলা থেকেই মাকে সে ঘরের কাজে সাহায্য করতো।’ এ সময় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, দেশব্যাপী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ড. কামাল আব্দুল নাসের চৌধুরী, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাহ্উদ্দিন এবং একাত্তর টেলিভিশনের এডিটর-ইন-চার্জ ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর পরিচালনা বোর্ডের সদস্য মোজাম্মেল বাবু।
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক : পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট নারকীয় হত্যাযজ্ঞের প্রধান লক্ষ্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেও এ দিনের ঘটনায় প্রথম শহীদ হন শেখ কামাল। বজলুল হুদা তার স্টেনগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালকে হত্যা করে। আদালতে দেয়া বঙ্গবন্ধু বাড়ির অন্যতম পাহারাদার হাবিলদার কুদ্দুস সিকদারের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, বাড়িতে প্রথম ঢুকে মেজর বজলুল হুদা এবং ক্যাপ্টেন নূর চৌধুরী। সঙ্গে আরো কয়েকজন। বাড়িতে ঢুকেই তারা শেখ কামালকে দেখতে পায়। সাথে সাথে বজলুল হুদা স্টেনগান দিয়ে তাকে গুলি করে। শেখ কামাল বারান্দা থেকে ছিটকে গিয়ে অভ্যর্থনা কক্ষের মধ্যে পড়ে যান। সেখানে তাকে আবার গুলি করে হত্যা করা হয়। বঙ্গবন্ধু ভবনের আবাসিক ব্যক্তিগত সহকারী এবং হত্যা মামলার বাদী মুহিতুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের মধ্যেও এ বর্ণনার কথা রয়েছে। তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল শফিউল্লাহকে বাড়ি আক্রমণের পর বঙ্গবন্ধু টেলিফোনে যা বলেছিলেন তাতেও এর সত্যতা পাওয়া যায়। ১৯৮৭ এবং ১৯৯৩ সালে একটি জাতীয় দৈনিকে দু’টি সাক্ষাৎকারে শফিউল্লাহ বলেছেন, বাড়ি আক্রমণের পর বঙ্গবন্ধু জলদি ফোর্স পঠানোর জন্য তাগিদ দিয়ে তাকে ফোন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘শফিউল্লাহ তোমার ফোর্স আমার বাড়ি এ্যাটাক করেছে। কামালকে বোধ হয় মাইরা ফেলছে। তুমি জলদি ফোর্স পাঠাও।’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের কালো রাতের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাসায় অবস্থান করা তার ব্যক্তিগত সহকারি আব্দুর রহমান শেখ রমাও এভাবেই বর্ণনা দিয়েছেন পনেরই আগস্ট হতাকান্ডের। ভোর রাতে ধানমন্ডির বাড়িটি আক্রান্ত হওয়ার সময় বঙ্গবন্ধু যে ঘরে ছিলেন তাঁর বাইরের বারান্দায় ঘুমিয়েছিলেন শেখ রমা।আব্দুর রহমান শেখ রমা ঊনসত্তর সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর পরিবারে কাজ করতেন, একাত্তরের ওই পরিবারের সঙ্গে ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়ে যে মামলা করা হয় তার দ্বিতীয় সাক্ষি এই রমা। ‘সেদিন ভোর রাতে বাড়িটির দিকে দক্ষিণ দিক থেকে সরাসরি আক্রমণ শুরু হয়। একটু পরেই বঙ্গবন্ধু তার ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসেন। বেগম মুজিবের কথায় আমি নিচে নেমে মেইন গেটের বাইরে এসে দেখি সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য গুলি করতে করতে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে এগুচ্ছে। তখন আমি বাড়ির ভেতরে ফিরে দেখি, লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা অবস্থাতেই বঙ্গবন্ধু নিচতলায় নামছেন।’ বলেন রমা। পরে রমা দ্রুত দোতলায় গিয়ে দেখেন, বেগম মুজিব আতঙ্কিত অবস্থায় ছোটাছুটি করছেন। রমা সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে তিনতলায় চলে যান এবং শেখ কামাল ও তার স্ত্রী সুলতানা কামালকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। তখন দ্রুত শার্ট-প্যান্ট পরে নিচতলায় নামেন শেখ কামাল। সুলতানা কামাল চলে যান দোতলায়। পরে শেখ জামাল ও তার স্ত্রীকে ঘুম থেকে ডেকে তুললে তারা দ্রুত জামা-কাপড় পরে বেগম মুজিবের কক্ষে যান।’ রমা বলেন, গোলাগুলির মধ্যে অভ্যর্থনা কক্ষে বঙ্গবন্ধুর সামনেই বিভিন্ন জায়গায় ফোন করতে থাকেন মহিতুল ইসলাম। পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টার এক পর্যায়ে রিসিভার নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব বলছি’। বঙ্গবন্ধু তাঁর কথা শেষ করতে পারেননি। একঝাঁক গুলি জানালার কাঁচ ভেঙে অফিসের দেয়ালে লাগে। বঙ্গবন্ধু তখন টেবিলের পাশে শুয়ে পড়েন। এর মধ্যেই গৃহকর্মী আব্দুলকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে তাঁর পাঞ্জাবি ও চশমা পাঠিয়ে দেন বেগম মুজিব। কিছুক্ষণ পর গুলিবর্ষণ থেমে গেলে বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়িয়ে আব্দুলের হাত থেকে পাঞ্জাবি আর চশমা নিয়ে পরেন। নিচতলার এই ঘর থেকে বারান্দায় বের হয়ে বঙ্গবন্ধু পাহারায় থাকা সেনা ও পুলিশ সদস্যদের বলেন, ‘এতো গুলি হচ্ছে, তোমরা কী করছ?’ এ কথা বলেই বঙ্গবন্ধু উপরে চলে যান। বঙ্গবন্ধু উপরে উঠতে না উঠতেই শেখ কামাল নিচে নেমে বারান্দায় দাঁড়ান। তখন কোনো কথা না বলেই শেখ কামালের পায়ে গুলি করে বজলুল হুদা। নিজেকে বাঁচাতে লাফ দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়েন শেখ কামাল। বলতে থাকেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল।’ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে শেখ কামালকে লক্ষ্য করে বজলুল হুদা তার হাতের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যান শেখ কামাল। প্রবাসী লেখক ও গবেষক গোলাম মুরশিদ ‘মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিষদ বিবরণ দিয়েছেন। শেখ কামাল নিহত হওয়ার পর মহিউদ্দিন ও তার সঙ্গীরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে মুজিবকে খুঁজতে থাকে। শেষে তাঁর দেখা পায় সামনের বারান্দায়। সাহসের প্রতিমূর্তি মুজিব দাঁড়িয়ে আছেন প্রশান্তভাবেÑ হাতে পাইপ। তাঁকে দেখে খুনী মহিউদ্দিন পর্যন্ত ভড়কে যায়। বঙ্গবন্ধুকে গুলি করতে পারেনি। কেবল বলেÑ ‘স্যার, আপনে আসেন’। শেষে যখন তাঁকে ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামাতে আরম্ভ করে তখন বঙ্গবন্ধু চিৎকার করে বলেন, ‘তোরা আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?’ এ সময় মহিউদ্দিনকে এক পাশে সরতে বলে হুদা আর নূর স্টেনগান দিয়ে গুলি করে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধুর ওপর। ভোর পাঁচটা চল্লি¬শে বঙ্গবন্ধু মুখ থুবড়ে লুটিয়ে পড়েন সিঁড়িতে। তখনো তাঁর ডান হাতে ধরা পাইপ। কয়েকটা গুলি তাঁর বুকের ডান দিকে এবং পেটে লেগেছিলো। ফলে যখন সূর্য ওঠার কথা, সেই সূর্য ওঠার সময় বঙ্গের গৌরব-রবি গেলো অস্তাচলে। বাসস।
নিউজফ্ল্যাশ ডেস্ক : বিশ্ব-গণমাধ্যম এবং রাষ্ট্রনায়কদের চোখে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ক্ষণজন্মা পুরুষ। তাদের কাছে বঙ্গবন্ধু এক অনন্য সাধারণ নেতা। যিনি ‘স্বাধীনতার প্রতীক’ বা ‘রাজনীতির ছন্দকার’। তারা মনে করেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের নেতা এবং তাদের সেবায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাকে দেয়া ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবে এই দেশপ্রেমিক নেতার প্রতি দেশের সাধারণ মানুষের গভীর ভালোবাসা প্রতিফলিত হয়েছে বলেও তারা মনে করেন। বিদেশী ভক্ত, কট্টর সমালোচক এমনকি শত্রুরাও তাদের নিজ নিজ ভাষায় তাঁর উচ্চসিৎ প্রশংসা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় এবং নিহতের পর, এমন কি বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শনকালে বিশ্ব নেতারাও শেখ মুজিবুর রহমান যে জনগণের নেতা এবং তাদের সেবায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন বঙ্গবন্ধু ভবনে রক্ষিত পরিদর্শক মন্তব্য বইয়ে তাই বলেছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনগণের নেতা এবং তাদের সেবায় সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাকে দেয়া বঙ্গবন্ধু খেতাবে এই দেশপ্রেমিক নেতার প্রতি দেশের মানুষের গভীর ভালবাসা প্রতিফলিত হয়।’ ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০১৩ সালের ৪ মার্চ ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে মন্তব্য বইয়ে এমন মন্তব্য লিখেছিলেন। তিনি দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্রতী এই মহান স্বপ্নদ্রষ্টা ও বিশ্ব রাষ্ট্রনায়ককে অভিবাদন জানান।। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং মন্তব্য বইয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সম্মোহনী এবং অসীম সাহসী নেতৃত্বের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর জনগণের নেতৃত্বদান করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন মহান দূরদর্শী এবং রাষ্ট্রনায়কের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি যিনি স্বাধীন, উন্নত এবং গর্বিত বাংলাদেশের দৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জার্মানীর সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিয়ান উলফ বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেন, ‘এই স্মৃতি জাদুঘর আমাদের একজন মহান রাষ্ট্রনায়ককে স্মরণ করিয়ে দেয়, যিনি তার জনগণের অধিকার ও মর্যাদার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং অতিদ্রুত স্বাধীনতা ও জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন।’ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী বলেন, ‘দূরদৃষ্টি সম্পন্ন একজন নেতা এবং রাষ্ট্রনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। তিনি স্বাধীনতার জন্য প্রতিকূলতা ও বিরূপ পরিস্থিতি উপেক্ষা করে অটল সাহসিকতার সাথে লড়াই করেছেন।’ সোনিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক এবং সমতার ভিত্তিতে মর্যাদা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাঁর জনগণকে ক্ষমতাবান করতে চেয়েছিলেন। স্বাধানীতার পরপরই বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। তাঁর আত্মত্যাগ সব সময় সম্মানিত হবে, পরবর্তী প্রজন্ম এ আত্মত্যাগকে সম্মান করবে এবং এ সম্মান অব্যাহত থাকবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় তার বাংলাদেশ সফরের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেছিলেন। এসময় মন্তব্য বইয়ে তিনি লিখেন, এই উপ-মহাদেশের প্রতিটি মুক্তিকামী, মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল মানুষের মনে বঙ্গবন্ধু এক জ্বলন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি, স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্থপতি এবং পিতা। মমতা বলেন, বাংলা ভাষাকে বিশ্বের মঞ্চে অন্যতম শ্রেষ্ঠত্বে মর্যাদা এনে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তিনি সেই বিরল নেতা, যার প্রতি ধর্মমত নির্বিশেষে সকল মানুষ প্রণাম জানিয়ে ধন্য হয়। থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন শেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। বিগত বিংশ শতাব্দীর জীবন্ত কিংবদন্তী কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হিমালয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্যাস্ট্রো বলেন, ‘আমি হিমালয়কে দেখেনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এই মানুষটি ছিলেন হিমালয় সমান। সুতরাং হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি। ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ক্যাস্ট্রোর সাক্ষাৎ হয়। শ্রীলংকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী লক্ষ্মণ কাদির গামা (নৃশংস হত্যার শিকার) বাংলাদেশের এই মহান নেতা সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়া গত কয়েক শতকে বিশ্বকে অনেক শিক্ষক, দার্শনিক, দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক, রাজনৈতিক নেতা ও যোদ্ধা উপহার দিয়েছে। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সবকিছুকে ছাপিয়ে যান, তাঁর স্থান নির্ধারিত হয়ে আছে সর্বকালের সর্বোচ্চ আসনে। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে এন দীক্ষিত বঙ্গবন্ধুর মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, প্রথম সরকার প্রধান জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশে বাংলাদেশের পৃথক জাতিসত্তায় গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিলেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধুকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে চিত্রিত করলেও ইতিহাসই তাঁর প্রকৃত অবস্থান নিশ্চিত করে যখন তাঁর এককালীন ঘোরতর শত্রু তাকে ‘মহান দেশপ্রেমিক’ হিসেবে অভিহিত করে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাবেক পাকিস্তানি (বেলুচিস্তান) অফিসার মেজর জেনারেল তোজাম্মেল হোসেন মালিক পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছেন, ‘বস্তুত মুজিব দেশদ্রোহী ছিলেন না (পাকিস্তানে তাকে ব্যাপকভাবে চিত্রিত করা হলেও)। নিজ জনগণের জন্য তিনি ছিলেন এক মহান দেশপ্রেমিক।’ আরেকজন সেনা কর্মকর্তা তৎকালীন পাকিস্তানি জান্তার মুখপাত্র মেজর সিদ্দিক সালিক বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী ৭ মার্চের ভাষণের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। সালিক তার ‘পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের দলিল’ গ্রন্থে লিখেছন, ‘রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর ঘরমুখো মানুষের ঢল নামে। তাদের দেখে মনে হচ্ছিল আশাব্যঞ্জক বাণী শ্রবণ শেষে মসজিদ অথবা গীর্জা থেকে তারা বেরিয়ে আসছেন।’ তথাকথিত ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার’ অভিযোগে সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার হবে’Ñ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার এই ঘোষণার পর গোটা বিশ্ব প্রতিবাদ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট হয়। তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্ট এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্য নিয়ে নতুন করে বাড়াবাড়ি করলে তার প্রতিক্রিয়া অনিবার্যভাবে পাকিস্তান সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়বে । বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধুর এই জনপ্রিয়তার কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার পর্যন্ত আশংকা করেন ইয়াহিয়ার প্রতি সমর্থনের জন্য নিক্সন প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিশ্ববাসীর ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। এ কারণে পাকিস্তানকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়, শেখ মুজিবকে ফাঁসি অথবা দীর্ঘদিন কারাবন্দি করে রাখা হলে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হারাবে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ, বিশ্লেষক বা গণমাধ্যমের বাইরে বঙ্গবন্ধু বিদেশী জনগণেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। আমেরিকান মিশনারী জেনিন লকারবি’র মত রাজনীতির সঙ্গে ওইসব মানুষের সম্পর্ক খুবই নগণ্য। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে চট্টগ্রামে ছিলেন লকারবি। তার ‘অনডিউটি ইন বাংলাদেশ’ বইয়ে লকারবি লিখেছেন ‘এমন একজন মানুষের আবির্ভাব ঘটছে, যে অনগ্রসর বাঙালি জাতিকে মুক্তির স্বাদ দেবে, তাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান, আদর করে ডাকা হয় ‘মুজিব’। ব্রিটিশ হাউস অব লর্ডসের সদস্য ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শীর্ষস্থানীয় যোদ্ধা ফেনার ব্রুকওয়ে বলেছেন, সংগ্রামের ইতিহাসে লেনিন, রোজালিনবার্গ, গান্ধী, নকুমা, লুমুমবা, ক্যাস্ট্রো ও আলেন্দে’র সঙ্গে মুজিবের নামও উচ্চরিত হবে। ব্রুকওয়ে আরো বলেন, ‘তাকে হত্যা করা ছিল মানব হত্যার চেয়ে অনেক বড় অপরাধ। শেখ মুজিব শুধুমাত্র তাঁর জনগণের রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেননি। তিনি তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যও সংগ্রাম করেছিলেন। সেনেগালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদু দিউফ বঙ্গবন্ধুকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। ১৯৯৯ সালে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে এই আফ্রিকান নেতা বলেছিলেন, ‘আপনি এমন এক মহান পরিবার থেকে এসেছেন, যে পরিবার বাংলাদেশকে অন্যতম মহান ও শ্রদ্ধাভাজন নেতা উপহার দিয়েছে। আপনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনার দেশের জনগণ যথার্থই বাংলাদেশের মুক্তিদাতা হিসেবে বেছে নিয়েছিল।’ বাসস।
নিউজফ্ল্যাশ প্রতিবেদক : শোকাবহ আগস্ট মাসের প্রথম দিন ছিল আজ। এ উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করে। শোকের মাসের প্রথম দিন মধ্যরাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথম প্রহরে আলোর মিছিলের মধ্যদিয়ে মাসব্যাপী কর্মসূচির সূচনা হয়। মিছিলটি ধানমন্ডি ৩২নং সড়ক ধরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে গিয়ে শেষ হয়। আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগ আলোর মিছিলের আয়োজন করে। এসময় স্বেচ্ছাসেবেক লীগের সভাপতি নির্মল রঞ্জন গুহ ও সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান বাবু, সংগঠেনর নেতা গাজী মেজবাউল হোসেন সাচ্চু, এ কে এম মনোয়ারুল ইসলাম বিপুল উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও এ সময়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিন ও উত্তর আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকসহ ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের নেতারা জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকালে বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট কালরাতে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। পৃথিবীর এই ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি, তার সহধর্মিনী আরজু মনি ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন। জাতীয় শোক দিবস-২০২০ উপলক্ষে ২ আগস্ট রোববার সকাল ৯.৩০ টায় ধানমন্ডি বত্রিশ নম্বর বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ কৃষক লীগের উদ্যোগে স্বেচ্ছায় প্লাজমা-রক্তদান কর্মসূচী এবং এতিম-অনাথদের মাঝে ঈদ উপহার, মৌসুমী ফল ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী বিতরণ কর্মসূচী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ কর্মসূচী শেষে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সিং-এর মাধ্যমে উক্ত অনুষ্ঠান শুভ উদ্বোধন করবেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ.ফ.ম বাহাউদ্দিন নাছিম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন কৃষক লীগের সভাপতি কৃষিবিদ সমীর চন্দ। সঞ্চালনা করবেন সাধারণ সম্পাদক উম্মে কুলসুম স্মৃতি এমপি।
শুক্রবার, 31 জুলাই 2020 19:21

শোকের মাসে আওয়ামী লীগের কর্মসূচী

লিখেছেন
নিউজফ্ল্যাশ প্রতিবেদক : শোকাবহ আগস্টের প্রথম দিন আগামীকাল। ১৯৭৫ সালের এ মাসেই বাঙালি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল জাতির জনকের কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী, আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট কালরাতে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাদের হাতে একে একে প্রাণ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সন্তান শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশু শেখ রাসেলসহ পুত্রবধু সুলতানা কামাল ও রোজি জামাল। পৃথিবীর এই ঘৃণ্যতম হত্যাকান্ড থেকে বাঁচতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর সহোদর শেখ নাসের, ভগ্নিপতি আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি, তার সহধর্মিনী আরজু মনি ও কর্নেল জামিলসহ পরিবারের ১৬ জন সদস্য ও আত্মীয়-স্বজন। সেনাবাহিনীর কিছুসংখ্যক বিপদগামী সদস্য সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর গোটা বিশ্বে নেমে আসে তীব্র শোকের ছায়া এবং ছড়িয়ে পড়ে ঘৃণার বিষবাষ্প। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর নোবেল জয়ী পশ্চিম জার্মানীর নেতা উইলি ব্রানডিট বলেন, মুজিবকে হত্যার পর বাঙালিদের আর বিশ্বাস করা যায় না। যে বাঙালি শেখ মুজিবকে হত্যা করতে পারে তারা যেকোন জঘন্য কাজ করতে পারে। ভারত বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ও ও বিশিষ্ট সাহিত্যিক নীরদ সি চৌধুরী বাঙালিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিশ্বের মানুষের কাছে নিজেদের আত্মঘাতী চরিত্রই তুলে ধরেছে। দ্য টাইমস অব লন্ডন এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় উল্লে¬খ করা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই। একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকান্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের রায় কার্যকর করে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। একইভাবে বাঙালির আত্মঘাতী চরিত্রের অপবাদেরও অবসান ঘটেছে। টেলিগ্রাফ পত্রিকার মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পত্রিকাটি সেদিন সুদূরপ্রসারী মন্তব্য করেছিল। দেশের মানুষ এখন অনুধাবন করতে পারে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নস্যাৎ করে দেশে পাকিস্তানি ভাবধারা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যেই স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী এবং দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী বলেন, ১৫ আগস্টের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার জন্য ২১ আগস্ট জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধাপরাধী এবং ২১ আগস্টের হামলাকারীদেরও বিচার কাজ সম্পন্ন হবে। শোকাবহ আগস্টে সমগ্র জাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিক সংগঠনসমূহ যথাযোগ্য মর্যাদা, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও ভাবগম্ভীর আর বেদনাবিধূঁর পরিবেশে বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জাতীয় শোক দিবস পালন করবে। প্রতিবারের ন্যায় এবারও শোকার্ত বাঙালি জাতির সাথে একাত্ম হয়ে আওয়ামী লীগ ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে কেন্দ্রীয়ভাবে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। আওয়ামী লীগ-এর সর্বস্তরের নেতা-কর্মী সমর্থক এবং সকল সহযোগী, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসমূহের প্রতি বিস্তারিত কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। এছাড়াও, প্রতিবারের মত এবারও ১৫ আগস্টকে সামনে রেখে আগস্টের প্রথম দিন থেকেই শুরু হচ্ছে আওয়ামী লীগসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলোর বিস্তারিত কর্মসূচি। পুরো মাস জুড়েই পালিত হবে এসব কর্মসূচি। সরকারিভাবে পালিত হবে ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচি। আগামীকাল শোকের মাসের প্রথম দিনের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাত ১২ টা ১ মিনিটে শাকের মাসের প্রথম প্রহরে ধানমন্ডি ৩২ নং সড়ক ধরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর অভিমুখে আলোর মিছিল ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন, বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে বিকাল তিনটায় রক্তদান ও প্লাজমা সংগ্রহ কর্মসূচি এবং মাসব্যাপী সারাদেশে বৃক্ষ রোপন কর্মসূচি শুরু। এছাড়াও পবিত্র ঈদুল আযহা’র নামাজের পর ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টে নিহত সকল শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করার জন্য দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
নিউজফ্ল্যাশ প্রতিবেদক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। তবে সাধারণত লিখিত বার্তায় তিনি এই শুভেচ্ছা জানিয়ে থাকলেও এবার অডিও বার্তায় তিনি সবার কাছে এই ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। দেশের সব মোবাইল গ্রাহকের কাছে ভয়েস মেসেজ আকারে পৌঁছে যাবে প্রধানমন্ত্রীর এই ঈদ শুভেচ্ছা। মোবাইলে পাঠানো ভয়েস মেসেজে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসসালামু আলাইকুম। আমি শেখ হাসিনা বলছি। বছর ঘুরে আমাদের মাঝে আবার এসেছে পবিত্র ঈদুল আজহা। করোনা ভাইরাস মহামারির এই দুঃসময়ে সকল আঁধার কাটিয়ে ঈদুল আজহা আপনার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল আনন্দ।’ আত্মত্যাগের শিক্ষা প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আসুন, কোরবানির ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করি। আপনাকে এবং আপনার পরিবারের সকলকে পবিত্র ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’ ঈদ শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি চলমান করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মাথায় রেখে সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। অডিও বার্তার শেষ ভাগে তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাস রোধে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। সুস্থ থাকুন, নিরাপদ থাকুন। ঈদ মোবারক।’

এ বিভাগের সর্বশেষ সংবাদ

ফেসবুক-এ আমরা