জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে তাঁর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা সংহত করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সামরিক আইন প্রশাসনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালিত হলেও তিনি ধীরে ধীরে বেসামরিক রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৭ সালের গণভোট এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তাঁর নেতৃত্বকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ প্রদান করে।
আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ Craig Baxter তাঁর Bangladesh: From Nation to State গ্রন্থে উল্লেখ করেন যে, জিয়াউর রহমানের অন্যতম কৌশল ছিল “controlled democratization”—অর্থাৎ সীমিত পরিসরে গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন (Baxter, 1997, p. 102)। নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র এমন একটি রাজনৈতিক কাঠামো, যেখানে শাসকগোষ্ঠী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের আংশিক বিকাশ ঘটালেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রধান নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে সংরক্ষণ করে। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিভিন্ন উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে এ ধরনের রাজনৈতিক মডেল পরিলক্ষিত হয়।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় Craig Baxter-এর এই ব্যাখ্যার কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করা যেতে পারে। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী পরিস্থিতি, রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন ছিল।
জিয়ার পূর্ববর্তী ও সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতিতে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের বিভিন্ন উদাহরণ পাওয়া যায়। পাকিস্তানে আইয়ুব খানের “Basic Democracies”, ইন্দোনেশিয়ায় সুহার্তোর “New Order”, দক্ষিণ কোরিয়ায় পার্ক চুং-হির উন্নয়নমুখী কর্তৃত্ববাদ এবং ফিলিপাইনে ফের্দিনান্দ মারকোসের শাসনব্যবস্থায় নির্বাচন ও রাজনৈতিক কাঠামো বজায় থাকলেও প্রকৃত ক্ষমতা শাসকের হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। এই মডেলগুলোর সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার নামে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী শক্তির সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় বৈধতা অর্জনের জন্য নির্বাচনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য।
তবে জিয়াউর রহমানের মডেল এই ধারার মধ্যে থেকেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য প্রদর্শন করে। প্রথমত, তাঁর শাসন প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন থেকে ধীরে ধীরে বেসামরিকীকরণের দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টা প্রদর্শন করে। তিনি শুধুমাত্র সামরিক প্রশাসন বজায় রাখেননি; বরং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
জাগদল (জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল) ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৮ সালে গঠিত হয়, যা জিয়াউর রহমানের সমর্থক রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে একত্রিত করার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীকালে ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে একটি দলীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন।
দ্বিতীয়ত, জিয়ার নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র আদর্শিক পুনর্গঠনের সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল। “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ” ধারণার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রীয় পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এই ধারণায় বাংলাদেশের নাগরিকত্বকে জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর পক্ষে যুক্তি ছিল যে, বাংলাদেশের সকল নাগরিক একই জাতিগত পরিচয়ের অন্তর্ভুক্ত নন; বরং বিভিন্ন নৃগোষ্ঠী ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মানুষও রাষ্ট্রের সমান নাগরিক। এভাবে রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয় পরিচয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।
তৃতীয়ত, জিয়ার শাসনামলে নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে। এর ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের একটি সীমিত কিন্তু কার্যকর ক্ষেত্র তৈরি হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর শাসনব্যবস্থাকে একটি “hybrid political structure” বা সংকর রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে, যেখানে গণতান্ত্রিক এবং কর্তৃত্ববাদী উভয় বৈশিষ্ট্যের সহাবস্থান লক্ষ্য করা যায়।
চতুর্থত, জিয়াউর রহমান তাঁর রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন। বাজারমুখী অর্থনীতি, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার প্রদান তাঁর শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল। উন্নয়নকে রাজনৈতিক বৈধতার উৎস হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা তাঁর রাজনৈতিক কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তাত্ত্বিকভাবে, জিয়ার শাসনব্যবস্থাকে “semi-authoritarian” অথবা “electoral authoritarian” কাঠামোর আলোকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। তবে কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই শ্রেণিবিন্যাস তাঁর শাসনের পূর্ণাঙ্গ বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করার জন্য যথেষ্ট নয়। সমর্থক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, তাঁর ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক কাঠামো কেবল রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের উপকরণ ছিল না; বরং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের বৃহত্তর কৌশলের অংশ ছিল।
অন্যদিকে, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকে এই মডেলের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে জিয়াউর রহমানের “controlled democratization” একটি জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যেখানে সামরিক প্রভাব, রাজনৈতিক দলীয়করণ, আদর্শিক পুনর্গঠন এবং সীমিত গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ একযোগে কার্যকর ছিল।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের শাসনব্যবস্থা একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক বিকাশ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তাঁর শাসনামলে প্রবর্তিত রাজনৈতিক কাঠামো, দলীয় সংগঠন এবং নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মডেল পরবর্তী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর শাসনকালকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানায়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
লেখক: মো: হাফিজ-আল-আসাদ , সাবেক ছাএ দল নেতা, লেখক, গবেষক ও প্রচার সম্পাদক ইতিহাস এলামনাই এসাসিয়েশন (CUHADA)।






