শনিবার, ২৯শে নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

মা, রাজনীতি এবং রাষ্ট্র

(বাঁ দিকে) তারেক রহমান। (ডান দিকে) খালেদা জিয়া। ফাইল ফটো।

মা মৃত্যুশয্যায়। ছেলে বহু দূর লন্ডনে। সাধারণ পরিবারের নিয়মে এমন অবস্থায় সবাই ছুটে আসে, এসে মায়ের হাত ধরে। কিন্তু আমরা ভুলে গেলে চলবে না—এটি সাধারণ কোনো পরিবার নয়। এটি জিয়া পরিবার। এই পরিবারের সঙ্গে একটি দলের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত এবং রাষ্ট্রের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিষয় জড়িয়ে আছে। এখানে সিদ্ধান্ত কেবল আবেগে হয় না; সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে রাজনৈতিক ভার, সংগঠনের দায়, রাষ্ট্রের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট।

এই মুহূর্তে অনেকেই ছেলের দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তাকে কি আমরা শুধুই মায়ের ছেলে হিসেবে দেখছি, নাকি একজন রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবেও ভাবছি? যে পরিবার পাঁচ দশক ধরে দেশের রাজনীতির কেন্দ্র, সেখানে সিদ্ধান্ত কখনো একমাত্র পারিবারিক হয় না। মায়ের সংকটের মুহূর্তেও তাকে ভাবতে হচ্ছে—দল কোথায় দাঁড়িয়ে, দেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেবে, তার ফেরা কি নতুন কোন প্রক্রিয়া সক্রিয় করবে? দলের সামনে কি নতুন দায় আসবে?

যারা মনে করেন সাধারণ ঘরের নিয়মে সিদ্ধান্ত নিলে সব সমস্যা মিটে যেত, তারা সম্ভবত ভুলে যাচ্ছেন—এই পরিবার বহুদিন ধরে রাজনৈতিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আদালত থেকে শুরু করে প্রশাসন, মাঠপর্যায়ের সংঘাত থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আলোচনা—সবকিছু মিলিয়ে তারেক রহমানের প্রতিটি পদক্ষেপ রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে। একজন সাধারণ ছেলের মতো তার পরিস্থিতি নয়, এবং সেই কারণে পরিবারের সিদ্ধান্তও সাধারণ পরিবারের মতো হতে পারে না।

এদিকে অনলাইন পরিবেশে যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে—বিভিন্ন বট আইডি, নকল অ্যাকাউন্ট, উদ্দেশ্যমূলক পরিবর্তিত বক্তব্য—এগুলো আজ রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন অস্ত্র। আপনারা লক্ষ্য করেছেন, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে কেন্দ্র করে এমন সব মন্তব্য ছড়ানো হচ্ছে যার উৎস নেই, যুক্তি নেই, অথচ উদ্দেশ্য আছে। এ উদ্দেশ্য রাজনৈতিকভাবেই কাজ করে—সমর্থক গোষ্ঠীকে অস্থির করা, দলের ভেতরে বিভ্রান্তি তৈরি করা, পরিবারকে মানসিক চাপের মধ্যে ফেলা।

রাজনীতির মাঠেও আমরা অন্য রকম চিত্র দেখছি। কিছু ব্যক্তি, যারা নিজেদের কর্মী পরিচয় দেয়, নানা জায়গায় অপ্রাসঙ্গিক প্রদর্শন, ফুলের মালা, শোডাউন—এসব করে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করছে। নেতৃত্ব যখন হাসপাতালে, পরিবারের সদস্য যখন দূরদেশে সংকটের মধ্যে, তখন এই ধরনের আচরণ দলীয় শৃঙ্খলার প্রশ্ন তোলে। দলের নাম ব্যবহার করে আচরণ করতে গেলে আচরণের দায়িত্বও নিতে হয়। এই মুহূর্তে দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন, প্রদর্শন নয়।

বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন দেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আন্দোলন, কারাবাস, মামলা, রাজপথ—সব মিলিয়ে তার পথ আজ এই সংকটময় স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চলা মামলাগুলো, কারাবন্ধী অবস্থায় স্বাস্থ্য-অবনতি, চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা—এসব তার আজকের চিকিৎসাজনিত অবস্থার পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তাই আজকের এই মানবিক পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে আলাদা নয়।

সবচেয়ে গভীর দৃশ্যটি এই—দূর দেশে থাকা এক সন্তানের অবস্থান। মা মৃত্যুপথযাত্রী, কিন্তু দেশ, রাজনৈতিক কাঠামো, দল আর বৈশ্বিক সংক্রান্ত বাস্তবতা তাকে আটকে রাখছে। এই সম্পর্ককে আমরা অনেকেই শুধু রাজনীতির চশমায় দেখছি। অথচ সম্পর্কটি শুধু পরিবারের নয় এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব দলের ভবিষ্যৎ দেশের ভবিষ্যৎ এসব বিষয়ের উপর নির্ভরশীল । পরিবারটি আবার রাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক পরিবারের। ফলে সম্পর্কটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যার ভেতর নিলে মানসিকতা ও গতিপথকে বিভ্রান্ত করা হবে ।

জনগণের প্রতিক্রিয়ার দিকটিও এখানে লক্ষণীয়। মা–ছেলের সম্পর্কের জায়গায় অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এসে দাঁড়িয়েছে। মানবিক বিবেচনার পরিবর্তে ঠান্ডা মন্তব্য, তির্যক ব্যাখ্যা, অনলাইন ব্যঙ্গ—এগুলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তবতা দেখিয়ে দেয়, আমরা রাজনৈতিক অঙ্গনের সুস্থ নই সক্রিয় পেশাদার নই, অসুস্থ মানসিকতা সম্পন্ন । একটি দলের ভবিষ্যৎ, একটি আন্দোলনের পথ, একটি রাষ্ট্রের বিরোধী শক্তির অবস্থান, একটি পরিবারের সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে একই সূত্রে বাঁধা।

এ অবস্থায় আমাদের ভূমিকা যদি কিছু থাকে, তা হলো—এই মুহূর্তটিকে মানবিক এবং রাজনৈতিক উভয় দিক থেকে বোঝা। বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতার জন্য গায়ে মনো বাক্যে সৃষ্টি কর্তার কাছে প্রার্থনা করা । নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া। এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিবেশকে শান্ত ও পরিমিত রাখা।

কারণ এই সংকট ব্যক্তিগত, কিন্তু এর প্রতিফলন রাজনৈতিক—এবং এই রাজনৈতিক প্রতিফলন আবার ফিরে এসে প্রভাব ফেলবে রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের ওপর।
আমাদের সকলের উচিত তারেক রহমানের মনের আকুতির কথা, তার ব্যথার তোর মনের গভীর বেদনার কথা চিন্তা করে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে বেগম খালেদা জিয়ার পূর্ণ সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা।

মোঃ হাফিজ আল আসাদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষঃ