জরায়ুমুখ ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের অবহিত করা এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভবিষ্যৎ নার্সদের ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে মার্কস নার্সিং কলেজে ‘জরায়ুমুখ ক্যান্সার সচেতনতা ও প্রতিরোধ কর্মসূচি–২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় কলেজের হলরুমে এ সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। মার্কস নার্সিং কলেজ ও ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়, প্রতিরোধের উপায়, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে মার্কস নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ মোছা. নাসিমা পারভীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সার একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। তবে যথাসময়ে HPV টিকাদান, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা এবং সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, নার্সিং পেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা শুধু রোগীর সেবা প্রদান করেন না, বরং পরিবার ও সমাজের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই নার্সিং শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যশিক্ষা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে দক্ষ হয়ে উঠতে হবে। শিক্ষার্থীদের অর্জিত জ্ঞান ভবিষ্যতে রোগীদের সঠিক পরামর্শ প্রদান এবং সমাজে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে সহায়তা করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বক্তব্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে গুরুত্বারোপ
অনুষ্ঠানে মার্কস নার্সিং কলেজের কোর্স কো-অর্ডিনেটর নয়ন হালদার বক্তব্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে সচেতনতা, সময়মতো পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যশিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকর্মী ও সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে নার্সিং শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জন করতে হবে, যাতে তাঁরা ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে রোগীদের সচেতন করতে পারেন এবং HPV টিকাদান ও নিয়মিত স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন।
তিনি আরও বলেন, ক্যান্সার সম্পর্কে ভয় বা সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক নারী সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে দ্বিধা করেন। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ৯০–৭০–৯০ লক্ষ্যমাত্রা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০৩০ সালের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে নির্মূলের লক্ষ্যে ৯০–৭০–৯০ কৌশল নির্ধারণ করেছে। এ কৌশলের আওতায় ১৫ বছর বয়সের মধ্যে ৯০ শতাংশ মেয়েকে HPV টিকার আওতায় আনা, ৩৫ ও ৪৫ বছর বয়সে যথাক্রমে ৭০ শতাংশ নারীকে উচ্চ কার্যক্ষমতাসম্পন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে স্ক্রিনিং করা এবং জরায়ুমুখের রোগে আক্রান্ত নারীদের মধ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী ৯০ শতাংশের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
HPV বা হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের নির্দিষ্ট কিছু ধরন জরায়ুমুখ ক্যান্সারের প্রধান কারণ। উপযুক্ত বয়সে HPV টিকা গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং অস্বাভাবিক পরীক্ষার ফল পাওয়া গেলে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে এ রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে প্রতিরোধ কার্যক্রম ও সচেতনতার গুরুত্ব
বাংলাদেশে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে HPV টিকাদান, স্বাস্থ্যশিক্ষা, সচেতনতামূলক প্রচার এবং স্ক্রিনিং কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে কিশোরীদের HPV টিকাদানে উৎসাহিত করা, নারীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পর্কে অবহিত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্বাভাবিক যোনিপথে রক্তপাত, সহবাসের পর রক্তপাত কিংবা অস্বাভাবিক স্রাবের মতো লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে জরায়ুমুখ ক্যান্সারের কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। তাই উপসর্গ না থাকলেও বয়স ও জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের গুরুত্ব রয়েছে।
নার্সিং শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ
মার্কস নার্সিং কলেজের এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের মধ্যে জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান বৃদ্ধি করা এবং ভবিষ্যৎ নার্স হিসেবে তাঁদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি নিয়মিত আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে ব্যক্তিগত সচেতনতা, সময়মতো টিকাদান, স্ক্রিনিং এবং যথাযথ চিকিৎসার সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি সুস্থ ও সচেতন সমাজ গঠনে অবদান রাখতে।








