ঢাকার সাভারে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হামলায় তিন সংবাদকর্মী আহত হয়েছেন। তারা হলেন- এসএটিভির সাভার প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেন, দেশ টিভির নিজস্ব প্রতিবেদক তাইফুর রহমান তুহিন, ক্যামেরা পার্সন মনিরুল হক কাইয়ুম ও গাড়ি চালক জয়নাল।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, মাদকের বিরুদ্ধে খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে মাদক ব্যবসায়ীর হামলার শিকার হন তারা।
শুক্রবার (২২ মে) দুপুরের দিকে উপজেলার পশ্চিম রাজাসন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগীরা জানান, সকালের দিকে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের বিস্তার নিয়ে প্রতিবেদন করতে যান দেশ টিভির ওই সাংবাদিক। তার সঙ্গে যান এসএটিভির স্থানীয় প্রতিনিধি। এ সময় প্রতিবেদনের তথ্য সংগ্রহ শেষে ফেরার সময় গাড়িতে ওঠার পরপরই তাদের সঙ্গে এক ব্যক্তি কথা বলতে চান। গাড়ি থেকে নামতেই তাদের ওপর তারা ৪০-৫০ জন অতর্কিতে দেশিয় অস্ত্রসহ হামলা চালায়। তারা সাংবাদিকদের বহনকারী গাড়ি ভাংচুরসহ তাদের শরীরে ছুরিকাঘাত করেন। একপর্যায়ে সব জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাদের অভিযুক্ত মাদক ব্যবসায়ীর গ্যারেজে নিয়ে যায়। একপর্যায়ে আহত সাংবাদিকরা হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ করলে মাদক ব্যবসায়ী পুলিশে খবর দেওয়ার কথা জানায়। পরে পুলিশ সদস্যরা এসে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

তাদের অভিযোগ, হামলাকারীরা দুই সাংবাদিককে ছুরিকাঘাত করাসহ পুরো টিমের সদস্যদের এলোপাথাড়ি মারধর করে পার্শ্ববর্তী একটি গ্যারেজে নিয়ে আটকে রেখে মুচলেকা নেওয়ার চেষ্টা করে। পাশাপাশি দেশ টিভির একটি প্রাইভেট কার ভাংচুর করাসহ দুই সাংবাদিকের কাছে থাকা মানিব্যাগ, নগদ টাকা, ক্যামেরাসহ অন্যান্য ইকুইপমেন্ট ছিনিয়ে নিয়ে যায়।
দেশ টিভি’র জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক ও হামলার শিকার সাংবাদিক তাইফুর রহমান তুহিন বলেন, সকালে অফিসের এসাইনমেন্টে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের বিস্তার নিয়ে সংবাদ সংগ্রহের জন্য ওই এলাকায় যাই আমরা। আমাদের সাথে এসএ টিভির স্থানীয় প্রতিনিধি সাদ্দাম হোসেনও ছিল। এ সময় স্থানীয় বিভিন্ন মানুষের বক্তব্য গ্রহনসহ যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে ফিরে আসছিলাম। এসময় যেই গলিটি শামীমের মাদক ব্যাবসায়ের জন্য খ্যাত, সেই গলিতে একটু থেমে দূর থেকে মাদক সিন্ডিকেটের সেখানে ইন্সটল করা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে গাড়িতে উঠে চলে আসার সময় একজন ব্যক্তি কথা বলতে চায়। পরে আমি গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই মাদক ব্যবসায়ী শামীমসহ ৪০/৫০ জন লোক দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে আমাদের উপর অতর্কিতভাবে হামলা চালায়।
”এসময় হামলাকারীরা আমাদের গাড়ি ভাংচুর করাসহ আমাদের এলোপাথাড়ি মারধর, আমার পেটে ও পিঠে ছুরিকাঘাত, সাদ্দামের চোখে ছুরিকাঘাত করার পাশাপাশি আমাদের সাথে থাকা যাবতীয় জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিয়ে প্রকাশ্যে আমাদের তুলে শামীমের গ্যারেজে নিয়ে যায়। সেখানেও আমাদের উপর নির্যাতন চালায় হামলাকারীরা। এক পর্যায়ে আমরা আমাদের হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানালে শামীম জানায় পুলিশ আসছে, তারা আসলে মুচলেকা দিয়ে তারপর যেতে হবে। এর কিছুসময় পর প্রথমে পুলিশের একটি টিম, ও পরে আরও কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সেখান থেকে আমাদের উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করে”, যোগ করেন তুহিন।
আহত সাদ্দাম হোসেন বলেন, সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ী শামীমকে নিয়ে পৃথক দুটি প্রতিবেদন করার পর তুহিন ভাই আমার সাথে যোগাযোগ করে মাদকের বিস্তার নিয়ে রিপোর্ট করার কথা জানায় এবং আমাকে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। সেই সুবাদেই আমি আজ দেশ টিভির টিমের সাথে যোগ দেই। হামলার এক পর্যায়ে শামীম পিস্তল ঠেকিয়ে আমাকে গুলি করতে উদ্ব্যত হলে আরেক ব্যক্তি ৩ দফায় আমাকে ছুরিকাঘাত করে এবং একটি আঘাত আমার চোখের কোনে লাগে। এছাড়াও তাকে নিয়ে সম্প্রতি আমি রিপোর্ট করায় আমার উপর ক্ষোভ ছিল তার।
সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরী বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. সোনিয়া রহমান বলেন, আমরা দুজন পেশেন্ট পেয়েছি এর মধ্যে একজনের (তুহিন) শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল হলেও আরেকজনের (সাদ্দাম) চোখে গুরুতর জখম থাকায় তাকে আমরা ন্যাশনাল আই ইন্সটিটিউটে রেফার্ড করেছি। যদিও অন্য যে পেশেন্ট স্থিতিশীল রয়েছে, তাকেও তার স্বজনদের অনুরোধে অন্যত্র রেফার্ড করা হয়েছে। আহত উভয়ের শরীরেই ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে বলেও জানান এই চিকিৎসক।
এদিকে ঘটনার পর খবর পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় সকলকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করে সাভার মডেল থানা পুলিশ। এছাড়াও ঘটনাস্থল থেকে ঘটনার সাথে জড়িত ৪ জনকে আটক করার কথা জানিয়েছেন সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী।
ওসি বলেন, খবর পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থল থেকে আহতদের উদ্ধার করে পুলিশের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে পাশাপাশি ঘটনাস্থল থেকে জড়িত ৪ জনকে আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় মূল অভিযুক্ত শামীমসহ অন্যান্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলার পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এর আগে গত ১০ মে রাতে গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মাদক ব্যবসায়ী শামীমকে টার্গেট করে ওই এলাকায় অভিযান চালায় র্যাব। যদিও অভিযানে শামীমকে গ্রেপ্তার করা গেলেও পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে ৩ জনকে একটি বিদেশি পিস্তল, হেরোইন, ইয়াবা ও গাজাসহ গ্রেপ্তার করে র্যাব।
র্যাব সুত্র জানায়, তাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী শামীম নিজের কাছে মাদক না রেখে লোকজন দিয়ে মদকের ব্যবসা ডিল করে। সেদিন অভিযানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছে, তারাও শামীমের সহযোগী এমনটাই ধারণা র্যাবের। এছাড়াও শামীমের নামে সাভার ও আশুলিয়া থানায় একাধিক মামলা থাকার তথ্য জানিয়েছে র্যাব।
ছবি- ভিডিও থেকে নেওয়া।






