মঙ্গলবার, ২৭শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে নারী বিদ্বেষী প্রচারণা চলছে : ডা. ফওজিয়া মোসলেম

দেশে এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার চলছে। সেখানে নারীর প্রতি অত্যন্ত অবমাননাজনক নারীবিদ্বেষী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। একইসঙ্গে ধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন ধরণের প্রচার চলছে। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারী বিদ্বেষী যে প্রচারণা চলছে তার আমাদের ধারাবাহিকতার প্রতিফলন। এটা নারীবিদ্বেষ নারীর অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটা বড় বাধা সৃষ্টি করার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেই হুমকিটা এখনও পর্যন্ত নারী আন্দোলন খুবই ভালোভাবে মোকাবেলা করছে এবং ভবিষ্যতেও মোকাবেলা করবে। এই যে নারীবিদ্বেষী প্রচারণা আপনারা দেখবেন এখানে কিন্তু দাবিই আছে ধর্মকে ব্যবহার করা চলবে না কিন্তু তারপরেও আমরা দেখছি ধর্মকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের নারী-পুরুষ, ধর্ম, গোত্র নির্বিশেষে সকল সাধারণ জনগণ যাতে স্বেচ্ছায়, সুষ্ঠুভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেইজন্য যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ, এম, এম নাসির উদ্দীনের কাছে একটি স্মারকলিপি দেয়। সেই স্মারকলিপি প্রদান উপলক্ষে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ৭১টি সংগঠনের জোট সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি।

ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, রাজনীতিতে টাকার খেলা চলে, ক্ষমতার খেলা চলে তারই একটা প্রতিফলন এবার নারী প্রার্থী কম দেয়া। আমরা সবসময় সংরক্ষিত আসনের নারীদের সরাসরি নির্বাচন দেয়ার জন্য বলেছি কিন্তু এবার তা দেয়া হয়নি।নির্বাচনী পদ্ধতি যদি আমরা পরিবর্তন না করি, প্রার্থী বাছাই থেকে শুরু করে, রাজনৈতিক দলের প্রচার থেকে শুরু করে, ভোট দেয়ার পরিবেশ থেকে শুরু করে সব কিছু মিলিয়ে একটা মৌলিক পরিবর্তন না আনতে পারলে আমরা আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব না। সেখানে রাজনৈতিক দলের সংস্কৃতিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেখানে রাজনৈতিক দল নারীকে শুধু ভোটার হিসেবে দেখতে পছন্দ করছে তাকে রাজনৈতিক নেতৃত্বে দেখতে এখন পর্যন্ত অভ্যস্ত না।

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ধারাবাহিকভাবে আমরা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি বহন করছি, যে সংস্কার কমিশন নারী সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। নারী বিদ্বেষকে বিবেচনায় নেয় না সেখানে সংস্কারের জন্য কোন গণভোট এটা কোন প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি না।

নির্বাচনী প্রচারে নির্দিষ্ট দলকে ভোট দিলে বেহেশতে যেতে পারবে এমন প্রচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনী প্রচারে যেভাবে বলা হচ্ছে কোন কোন দলকে ভোট দিলে আমার জন্য স্বর্গের একেবারে দুয়ার খুলে যাবে। এটা আমি জানিনা, ধর্ম কখনও এইকথা বলতে দেয় কি না! কে স্বর্গে যাবে আর কে যাবে না সেই বিষয়টা তো এখানে নির্ধারিত হয়না। এটা তো যখন নির্ধারিত হবে তখন হবে। এভাবে বলাটা এটা ধর্মকে কতটুকু মানা হলো, ধর্ম প্রতিপালনের দিক থেকে কতটুকু ক্ষতিকর সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। একইসাথে সাথে নারী বিরোধী প্রচারণা করা যাবে না, বিভিন্ন আলোচনায় বা মাইকে নারীর বিরুদ্ধে কিছু বলা যাবে না বললে সেটার আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করা হয়েছে। কাজেই নারী বিদ্বেষকে আমরা এড্রেস করেছি, আমরা ধর্মকে কিভাবে নারীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে সেই যায়গাটা নিয়েও কথা বলেছি। আমরা রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও কথা বলছি। আমাদের মধ্যে যে ধর্মীয় শিকড় আছে সেটা যে নারী অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা এবং নির্বাচনে যে তার প্রতিফলন ঘটেছে সেটা নিয়ে আমরা কথা বলেছি।

একশন এইডের প্রতিনিধি মরিয়ম নেসা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো পাঁচ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়ার জন্য বলেছে কিন্তু কোন কোন রাজনৈতিক দল তা করেনি। সেটা নিয়ে আমরা কথা বলেছি, যেখানে নির্বাচন কমিশন বলেছে তারপরও কোন দল সেটা করেনি এটা নিয়ে কমিশনের কেন জবাবদিহিতার কোন যায়গা নেই। আমার চাওয়াটা নির্বাচন কমিশনের কাছে ভোটার এবং প্রার্থী সকল ক্ষেত্রেই যেন নারীর জন্য বন্ধুসুলভ পরিবেশ তৈরি হয়, যে তারা প্রার্থী হিসেবেও অংশগ্রহণ করতে পারবে, ভোটার হিসেবেও অংশগ্রহণ করতে পারবে। সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকে একটা জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে যে তারা যে পরিমাণ নারী প্রার্থী দেয়ার কথা ছিল তারা কেন দিতে পারেনি। সুতরাং সেই যায়গাটা থেকে একটা অনেক বড় গ্যাপ থেকে যাচ্ছে। আপনি বলছেন, এটা মানতে হবে। না মানলে কি হবে সেটা কেউ বলছে না।

অন্য একজন প্রতিনিধি বলেন, এবার বোধহয় রাজনৈতিক দলগুলাের নারীদেরকে খুশি করার কোন ব্যাপার নেই। তারা নারী প্রার্থীও দেয়নি। কোন নির্বাচনী ইশতেহারও ঘোষণা করেনি।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা বানু, গণ স্বাক্ষরতা অভিযানের মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস প্রিন্স, স্টেপস টুয়ার্ডস ডেভেলপমেন্টের চন্দন লাহিড়ী, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের প্রতিনিধি সাহিদা পারভীন শিখা, অ্যাডাবের প্রতিনিধি সমাপিকা হালদার, একশন এইডের মরিয়ম নেসা, তিথি ঘোষ, লুনা জহুর প্রমুখ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বরাবরে দেয়া স্মারকলিপিতে যে দাবিগুলো জানানো হয়েছে। সেগুলো হলো :
১. দেশের সকল স্তরের নাগরিক যাতে নির্ভয়ে, স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন পূর্ববর্তী, নির্বাচনকালীন এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ে নারীদের নিরাপত্তাসহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবং সুবিধাবঞ্চিত প্রান্তিক নারী-পুরুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
২. সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব ধরনের ডিজিটাল প্লাটফর্মে নারীদের প্রতি হয়রানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংস আচরণ প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৩. নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন ও যথাযথ মনিটরিং করতে হবে এবং এ বিষয়ে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে।
৪. স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীদের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুবিধা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং সে লক্ষ্যে দৃষ্টি দেওয়ার পাশাপাশি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
৬. জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার জন্য যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে।
৭. নির্বাচনী এলাকায় পর্যাপ্ত সংখ্যক আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন ও নিয়মিত টহল নিশ্চিত করতে হবে।
৮. সকল জনগণের নিরাপত্তার নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৯. যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
১০. নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের মানুষদের হয়রানি করা থেকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সর্বশেষ

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষঃ