07072020মঙ্গল
শিরোনাম:
শুক্রবার, 05 জুন 2020 12:20

সীমান্তে খুব বড় বৈঠক শনিবার, কিন্তু প্রত্যাঘাতের প্রস্তুতিও রাখছে ভারত

  আলোচনার প্রস্তুতি চলছে, এলএসি বরাবর পুরোদস্তুর সামরিক প্রস্তুতিও রাখছে ভারত। ছবি: পিটিআই। আলোচনার প্রস্তুতি চলছে, এলএসি বরাবর পুরোদস্তুর সামরিক প্রস্তুতিও রাখছে ভারত। ছবি: পিটিআই।
নিউজ ফ্ল্যাশ ডেস্ক: ‘মিরর পজিশন’ লাদাখে। অর্থাৎ ভারতকে চিন যা দেখাতে চাইছে, চিনকেও ভারত ঠিক সেটাই দেখাচ্ছে। লাদাখে এলএসি (প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা) বরাবর চিন কয়েক হাজার সেনা মোতায়েন করে থাকলে, ভারতও ততটাই মোতায়েন করে দিয়েছে। সম্ভবত কিছুটা বেশিই মোতায়েন করেছে। ঠিক যেন চিনের মুখের সামনে একটা আয়না ধরা হয়েছে। সামরিক পরিভাষায় সেটাই ‘মিরর পজিশন’। ঢিল এলে পাটকেল ফিরিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত। কিন্তু আলোচনা বন্ধ হয়নি। শনিবার কোর কম্যান্ডার পর্যায়ের বৈঠক বসতে চলেছে। সীমান্ত বিবাদ নিয়ে এই স্তরের বৈঠক ভারত-চিনের মধ্যে বিরল। অর্থাৎ আলোচনায় সমস্যা মিটতেই পারে। কিন্তু কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, চিন মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। চমকে দিয়ে হানাদারি চালাতে পারে পিএলএ। সুতরাং পাল্টা হানাদারির জন্যও কিন্তু প্রস্তুত থাকতে হবে ভারতীয় বাহিনীকে। ভারত এবং চিনের সীমা যেখানে মিশছে, অরুণাচল থেকে লাদাখ পর্যন্ত সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়েই নানা এলাকায় সীমান্ত নিয়ে বিরোধ রয়েছে। এলএসি বলে ভারত যে রেখাকে মানে, অনেক জায়গাতেই চিন সেই রেখাকে মানে না। এলএসি আসলে কোনটা, তা নিয়ে ভারত এবং চিনের ধারণায় ফারাক রয়েছে বলে অনেকে উল্লেখ করেন। কিন্তু এই ‘ধারণা’ শব্দটাই আপত্তিকর। এলএসি আসলে কোনটা, তা কারও ধারণার উপরে নির্ভর করে না। সেই ৬০-এর দশক থেকেই ঐতিহাসিক দলিল এবং ভৌগোলিক যুক্তি তুলে ধরে ভারত অত্যন্ত স্পষ্ট ভাবে চিনকে দেখিয়েছে ভারতের এলাকা কত দূর পর্যন্ত। কিন্তু এলএসি-র অবস্থান সম্পর্কে চিনের বক্তব্যে কোনও ধারাবাহিকতা নেই। তাদের দাবি বার বার বদলে যায়। বিভিন্ন সময়ে তারা এলএসি-র বিভিন্ন রকম অবস্থান দেখাতে থাকে। এবং নিজেদের ওই সব দাবির পক্ষে চিন কখনওই কোনও ঐতিহাসিক দলিল বা ভৌগোলিক যুক্তিও তুলে ধরতে পারে না। আচমকা কোনও একটা এলাকাকে নিজেদের বলে দাবি করে বসে। তাই ভারত এবং চিনের মধ্যে জিইয়ে থাকা সীমান্ত বিবাদ শুধুমাত্র ‘ধারণার ফারাক’— এ রকম বললে আসলে বিষয়টাকে লঘু করা হয়, চিনের কারসাজিগুলো স্পষ্ট হয় না। এলএসি-তে বিবাদ মিটিয়ে নেওয়ার জন্য কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (এসওপি) বা আদর্শ আচরণ বিধি তৈরি করে রেখেছে দু’দেশ মিলেই। ভারত যে রেখাকে এলএসি হিসেবে মানে, সব জায়গায় যে সেই রেখাকে চিন স্বীকৃতি দিতে চায় না, সে কথা আগেই বলেছি। ফলে কখনও চিনের টহলদার বাহিনী ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়ে। কখনও চিন অভিযোগ করে যে, ভারতীয় বাহিনী ঢুকে পড়েছে চিনা এলাকায়। এই রকম পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই এসওপি তৈরি করা হয়েছে। কে কার এলাকায় ঢুকেছে, তা নিয়ে যদি বিরোধ তৈরি হয়, তা হলে বিনা রক্তপাতে যাতে তা মিটিয়ে নেওয়া যায়, এসওপি হল তারই ব্যবস্থা। বাহিনী, সরঞ্জাম, অস্ত্র ও রসদ খুব দ্রুত লাদাখে পৌঁছে দেওয়া ভারতের পক্ষে কঠিন নয়। দৌলত বেগ ওল্ডি-র বিমানঘাঁটিতে সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিসের মতো বিশালকায় সামরিক বিমান আগেই নামিয়েছে ভারত। ফাইল চিত্র। কী রকম সেই ব্যবস্থা? কোনও বাহিনী যদি মনে করে যে, অন্য বাহিনী এলএসি অতিক্রম করেছে, তা হলে তাদের প্রথমে বাধা দেওয়া হবে। হিন্দি এবং চিনা ভাষায় লেখা ব্যানার তুলে ধরে জানানো হবে যে, সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে। মাইকেও তিন বার ঘোষণা করা হবে সে কথা এবং লঙ্ঘনকারী বাহিনীকে ফিরে যেতে বলা হবে। লঙ্ঘনের অভিযোগ যারা তুলছে, এটা তারাই করবে, অন্য পক্ষ ওই একই পথ নিতে পারবে না। এসওপি অনুযায়ী, এর পরে কিন্তু ওই এলাকা ছেড়ে ফিরে যেতে হবে দুই বাহিনীকেই। কোনও পক্ষই ঘটনাস্থলে তাঁবু খাটিয়ে বা বাঙ্কার বানিয়ে স্থায়ী ভাবে বসে যেতে পারবে না। বাহিনী বাড়িয়ে পরস্পরের উপরে চাপ তৈরি করতেও পারবে না। পরে প্রয়োজন হলে, স্থানীয় স্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত সামরিক আধিকারিকরা বৈঠকে বসবেন এবং আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে পৌঁছনোর চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ গুলি-গোলার বিনিময় হওয়া তো দূরের কথা, ভারত-চিন সীমান্তে গত বেশ কিছু বছর ধরে দু’দেশের বাহিনীর মধ্যে হাতাহাতি, ধস্তাধস্তি বা পাথর ছোড়াছুড়ির যে সব ঘটনা সামনে আসছে, এসওপি মানা হলে সে সব ঘটারই কথা নয়। তা-ও ঘটনাগুলো ঘটছে। এবং প্রতিবারই এই গোলমালগুলোর সূত্রপাত ঘটছে ভারত অভিযোগ তোলার পরেই। অর্থাৎ ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে, চিন এসে বাধা দিয়েছে এবং তার পরে সংঘর্ষ হচ্ছে, এমন নয়। বার বারই চিনের বিরুদ্ধেই লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। তার পরে একাধিক ক্ষেত্রেই চিনা বাহিনী আর ওই সব এলাকা ছেড়ে ফিরতে রাজি হচ্ছে না। ফলে সংঘর্ষ শুরু হয়ে যাচ্ছে। এসওপি সেই আশির দশকের শুরুর দিক থেকেই তৈরি হয়ে রয়েছে। কিন্তু তার লঙ্ঘনও বার বারই হচ্ছে। ইদানীং তার সংখ্যা বেড়েছে। সামরিক কর্তাদের নিজেদের আলোচনায় তাই এখন বার বারই লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংহ এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল হনুত সিংহ নামে দুই কম্যান্ডারের নাম উঠে আসছে। প্রথম জনের একটি পদক্ষেপ বহু বছরের জন্য ভারত-চিন সীমান্তে গোলাগুলি চলা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর দ্বিতীয় জন চিন সীমান্তের একটা বড় অংশের দায়িত্ব যখন সামলাচ্ছিলেন, তখন এক বারের জন্যও পিএলএ অর্থাৎ চিনা বাহিনী ওই এলাকায় এলএসি লঙ্ঘনের সাহস দেখায়নি। ১৯৬৭ সালে নাথু লা এবং চো লা-তে যে গোলাগুলি চলেছিল ভারত ও চিনের মধ্যে, তা চলেছিল এই সগত সিংহের নির্দেশেই। তখনও তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল হননি। সগত সিংহ তখন মেজর জেনারেল র‌্যাঙ্কে। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ডিভিশনের জিওসি (জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং)। রাইফেল থেকে এলএমজি (লাইট মেশিন গান), এলএমজি থেকে এইচএমজি (হেভি মেশিন গান)— ক্রমশ বাড়ছিল বিনিময়ের তীব্রতা। জিওসি মেজর জেনারেল সগত সিংহের নির্দেশে ভারতীয় সেনা আচমকা আর্টিলারি ফায়ার অর্থাৎ কামান থেকে গোলাবর্ষণ শুরু করেছিল। তাতেই থেমেছিল সঙ্ঘাত। সেই যে থেমেছিল, তার পর থেকে এ পর্যন্ত ভারত-চিন সীমান্তে আর কখনও গোলাগুলি চলেনি। সেই সময়ে অবশ্য এই কাণ্ডের জন্য জবাবদিহির মুখে পড়তে হয়েছিল মেজর জেনারেল সগত সিংহকে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্যাম মানেকশ সে বার মেজর জেনারেল সগত সিংহকে জানিয়েছিলেন, ভারত সরকার খুশি নয়। বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ ছাড়া আর্টিলারি ফায়ার শুরু করা উচিত হয়নি— সগত সিংহকে বলেছিলেন মানেকশ। নাথু লা-চো লা-তে পরিস্থিতি কী রকম ছিল এবং তা সামলাতে কী জরুরি ছিল, স্থানীয় কম্যান্ডার হিসেবে তিনি সেটা অন্য সবার চেয়ে ভাল বুঝেছিলেন, তাই আর্টিলারি ফায়ারের নির্দেশ দিয়েছিলেন— জবাব ছিল সগত সিংহের। বাহিনীর উচ্চতর কর্তারা সে জবাবে খুশি হননি। সগত সিংহকে ওই সীমান্ত থেকে সরিয়ে অন্য দায়িত্বে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১-এর ভারত-পাক যুদ্ধে সগত সিংহকে ফের বড় দায়িত্বে নিয়ে এসেছিলেন ওই স্যাম মানেকশ-ই। মানেকশ তখন সেনাবাহিনীর প্রধান। সগত সিংহ সে বারও নিজের পারদর্শিতা প্রমাণ করেছিলেন। মেঘনা পেরিয়ে ভারতীয় সেনা ঢাকায় ঢুকে পড়েছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংহের নেতৃত্বেই। ভারত সরকার ‘পরম বিশিষ্ট সেবা মেডেল’ এবং ‘পদ্মভূষণ’ দিয়েছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংহকে। ১৯৮০-র দশকের শুরুর দিকে বছরখানেকের জন্য ভারত-চিন সীমান্তের একটি বড় অংশের দায়িত্বে থাকা বাহিনীর নেতৃত্ব গিয়েছিল মেজর জেনারেল হনুত সিংহের হাতে। তখন ভারত-চিন সীমান্তে আর গোলাগুলি চলে না। কিন্তু চিনা বাহিনী প্রায়ই এলএসি পেরিয়ে ভারতীয় এলাকায় ঢুকে চোখ রাঙায়। আর্মার্ড ডিভিশনের দায়িত্ব ছেড়ে পাহাড়ি ডিভিশনের দায়িত্বে আসা হনুত সিংহ সম্ভবত প্রথমে বুঝতে পারছিলেন না যে, কী ভাবে বন্ধ করবেন চিনের এই প্রবণতা। কারণ পাহাড়ি ডিভিশনকে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁর সে ভাবে ছিল না। কিন্তু অল্প কিছু দিনেই পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন হনুত সিংহ। সীমান্তে মোতায়েন বাহিনীকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, এর পর থেকে যদি এলএসি লঙ্ঘন করে চিনা বাহিনী, তা হলে তিন বার সতর্ক করবে ভারতীয় সেনা। চিনা বাহিনী কথা না শুনলে ভারতীয় বাহিনীই আগে গুলি চালাবে। অর্থাৎ চিন যত ক্ষণ না গুলি চালাচ্ছে, তত ক্ষণ ভারতও ট্রিগারে আঙুল রাখবে না, এই নীতি আর চলবে না। সতর্কবার্তা না শুনলে গুলি চালানো হবে। জিওসি মেজর জেনারেল হনুত সিংহের এই নির্দেশ পেয়ে চনমনে হয়ে উঠেছিল সীমান্তে মোতায়েন ভারতীয় সেনা। তবে এই নির্দেশ শুধু ভারতীয় সেনার অন্দরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। চিনা সেনার কাছেও সে খবর পৌঁছে গিয়েছিল। নতুন জিওসি অত্যন্ত কড়া ধাতের কম্যান্ডার এবং সীমা লঙ্ঘনের ঘটনায় সতর্কবার্তা না শুনলে ভারতীয় বাহিনী গুলি চালাতে পিছপা হবে না— এমন বিরাট নির্দেশ তিনি দিয়ে দিয়েছেন, সে কথা চিনা সামরিক কর্তারা জেনে গিয়েছিলেন। অতএব হনুত সিংহ ওই এলাকার জিওসি যত দিন ছিলেন, তত দিন আর এক বারের জন্যও সীমা লঙ্ঘন করেনি চিনা বাহিনী। পরে হনুত সিংহও ভারতীয় সেনার লেফটেন্যান্ট জেনারেল হন। ১৯৭১-এর ভারত পাক যুদ্ধে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে বড়সড় যুদ্ধ জয়ের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ‘মহাবীর চক্র’ পান। চিন সম্প্রতি বা গত কয়েক বছরে যা শুরু করেছে, তাতে কিন্তু সগত সিংহ বা হনুত সিংহদের করা পদক্ষেপের মতো কোনও কিছুর কথা ভারতকে ভাবতে হবে আবার। চিন যে ইচ্ছাকৃত ভাবে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়াতে চাইছে, তা সবার কাছেই খুব স্পষ্ট। এলএসি-তে অর্থাৎ ভারত-চিন সীমান্তে দু’দেশের বাহিনীর মধ্যে বিরোধ তৈরি হলে তা স্থানীয় স্তরেই কী ভাবে মিটিয়ে নেওয়া যায়, তা দু’পক্ষেরই জানা। কিন্তু বিরোধ মিটছে না। চিনা বাহিনী কখনও তাঁবু গেড়ে বসে যাচ্ছে। কখনও আবার ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে তুমুল ধস্তাধস্তি, হাতাহাতি বা পাথর ছোড়াছুড়িতে জড়িয়ে পড়ছে। এসওপি মেনে চললে এ সবের কিছুই হওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ এসওপি মেনে চলতে চিন চাইছে না, নানা অছিলায় সঙ্ঘাত বাড়াতে চাইছে— এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। ভারতীয় বাহিনীর যে সে কথা বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে, তা-ও নয়। ২০১৭ সালে চিনের চোখে চোখ রেখে ৭৩ দিন ডোকলামে দাঁড়িয়ে ছিল ভারতীয় সেনা। বিতর্কিত এলাকার মধ্যে দিয়ে রাস্তা তৈরি বন্ধ করেই ফিরতে হয়েছিল চিনকে। আর এখন গলওয়ান উপত্যকা, প্যাংগং লেকের উত্তর তট এবং নাকু লা-তেও একই কায়দায় প্রতিস্পর্ধা দেখানো হচ্ছে। এলএসি বরাবর অন্তত ৩টি এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হয়েছে এ বার। বাহিনী সূত্রে জানতে পারছি, ১টি এলাকায় চিন ইতিমধ্যেই পিছু হঠেছে। চিনা বাহিনী যেখানে অবস্থান নিয়েছিল, সেখান থেকে তারা ৩-৪ কিলোমিটার পিছিয়ে গিয়েছে বলে জানতে পারছি। ভারতীয় বাহিনীও ৮০০ মিটার পিছিয়ে এসেছে। বাকি ২টি এলাকায় উত্তেজনা এখনও বহাল। সেই উত্তেজনা আর বাড়বে না বলেই আশা করব। কিন্তু যদি বাড়ে, তা হলে যোগ্য জবাব দেওয়ার সব প্রস্তুতি ভারতীয় বাহিনী নিয়ে ফেলেছে। শনিবার কোর কম্যান্ডার স্তরের বৈঠক বসছে ভারত ও চিনের মধ্যে। লাদাখের চুসুলে এই বৈঠক হবে। লেহ্‌ জেলার মধ্যে পড়ে চুসুল। অবস্থান প্যাংগং-এর দক্ষিণ দিকে এবং একেবারে এলএসি-র গায়ে। যে বৈঠক সেখানে হবে শনিবার, তা কিন্তু ভারত-চিনের মধ্যে বিরল। সীমান্ত বিরোধে বার বার স্থানীয় স্তরের আধিকারিকদের মধ্যেই বৈঠক হয়। বড় সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে খুব বেশি হলে ডিভিশনাল কম্যান্ডার অর্থাৎ মেজর জেনারেল র‌্যাঙ্কের আধিকারিকরা বৈঠকে বসেন। এই প্রথম কোর কম্যান্ডার স্তরের আধিকারিকরা বৈঠকে বসছেন। অর্থাৎ ট্যাকটিক্যাল লেভেল মিটিং নয়, তার চেয়ে অনেক বড় স্তরের মিটিংয়ে বসছে দু’দেশের সামরিক বাহিনী। এই বৈঠকের আয়োজন বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, এলএসি-তে কোনও পক্ষই এখন একটা পুরোদস্তুর যুদ্ধ চায় না। চিন হয়তো এ বার বড়সড় সঙ্ঘাতই চেয়েছিল। তার কারণ কী কী, সে সব আগেও ব্যাখ্যা করেছি। কিন্তু চালটা বোধহয় উল্টো ফল দিয়েছে। তাই পরিকল্পনা বদলাতে হচ্ছে চিনকে। এমনিতেই করোনা সংক্রমণের আবহে বিশ্বের অনেক বড় বড় শক্তি চিনকে সংশয়ের চোখে দেখতে শুরু করেছে। আমেরিকার সঙ্গে চলতে থাকা শুল্কযুদ্ধকে ঘিরেও আন্তর্জাতিক মহলের একটা প্রভাবশালী অংশ চিনের বিরুদ্ধে। সে সবের মাঝেই ভারতের সঙ্গে নিজেদের সীমান্ত বিবাদকে চিন বড়সড় উদ্বেগের জায়গায় নিয়ে যাওয়ায় কূটনৈতিক স্তরে চিন-বিরোধী আবহ আরও গাঢ় হয়েছে। এলএসি-তে চিনের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আমেরিকা প্রকাশ্যেই মুখ খুলতে শুরু করেছে। চিন আগ্রাসন দেখাচ্ছে বলে ওয়াশিংটন ডিসি মন্তব্য করেছে। এই সঙ্ঘাতে আমেরিকা কোন পক্ষে রয়েছে, তা-ও স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নেপালকে কাজে লাগিয়ে ভারতের অস্বস্তি একটু বাড়ানোর চেষ্টা করেছিল চিন। কিন্তু লিপুলেখ, কালাপানি, লিম্পিয়াধুরাকে নিজেদের অংশ হিসেবে দেখিয়ে যে মানচিত্র নেপাল প্রকাশ করার কথা ঘোষণা করেছিল, শেষ মুহূর্তে সেই মানচিত্র প্রকাশ স্থগিত করে দিয়েছে কাঠমান্ডু। দক্ষিণ চিন সাগরে নৌবহর পাঠিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ভারতের সীমান্তে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে দক্ষিণ চিন সাগরও যে তেতে উঠতে পারে, সম্ভবত নীরবে সেই বার্তাই দেওয়া হচ্ছে। ভারত বার বারই জানাচ্ছে, লাদাখে যে পরিস্থিতি চিন তৈরি করতে চাইছে, তার মোকাবিলা ভারত একাই করতে সক্ষম। কিন্তু ভারতের সঙ্গে এই সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে চিন আচমকা যে ভাবে আরও কোণঠাসা হয়েছে আন্তর্জাতিক শিবিরে, তার সুযোগও কিন্তু ভারতকে নিতে হবে। এলএসি-তে তৈরি হওয়া পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে চিনের পক্ষ নিয়ে কোনও বড় শক্তি মুখ খুলেছে, এমনটা কিন্তু এখনও দেখা যায়নি। ভারতের হয়ে একাধিক বড় শক্তি মুখ খুলেছে। এই আন্তর্জাতিক চাপ বহাল থাকাকালীন সীমান্ত নিয়ে দু’দেশের ‘ধারণার ফারাক’ যতটা সম্ভব মিটিয়ে নেওয়া দরকার। এলএসি ঠিক কোনটা, সেটা এ বার চূড়ান্ত হয়ে যাক। কোর কম্যান্ডার স্তরের বৈঠকে তা চূড়ান্ত হওয়া সম্ভব না হলেও তার প্রস্তাবনাটা হয়ে যেতেই পারে। তার পরে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সীমান্ত চিহ্নিত করা হোক এবং দু’পক্ষই সেই সীমান্তরেখাকে মান্যতা দিক। তাতে দু’পক্ষকেই কোথাও না কোথাও কিছু না কিছু ছাড়তে হতে পারে। কিন্তু এ বার খুব বড় সুযোগ এসেছে ভারতের সামনে। সমস্যাটা নির্মূল করে ফেলা উচিত। তবে আবার বলছি, চিন একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। চিনের আচরণে ধারাবাহিকতা খুব কম। কোর কম্যান্ডার স্তরের বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। কূটনৈতিক স্তরেও হয়তো কথাবার্তা হতে পারে এর পরে। কিন্তু এই সব আলোচনার প্রক্রিয়া চলার মাঝেই কোনও সেক্টরে চমকে দিয়ে চিন হানাদারি চালাতে পারে, ভারতীয় এলাকায় ঢুকে পড়ে শিবির তৈরির চেষ্টা করতে পারে। ভারতকে কিন্তু সে সবের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। চিন যদি কোনও সেক্টরে হানাদারি চালায়, তা হলে অন্য কোনও সেক্টরে পাল্টা হানাদারি চালিয়ে যাতে চিনা এলাকা কব্জা করে নেওয়া যায়, সেই পরিকল্পনাও তৈরি রাখতে হবে। যত দূর খবর পাচ্ছি, সে সব প্রস্তুতিও নিয়ে ফেলেছে ভারতীয় সেনা। এলএসি-তে যে পরিমাণ বাহিনী ইতিমধ্যেই মোতায়েন করা হয়েছে, যে পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র এবং সরঞ্জাম পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা চিনের চেয়ে বেশি বই কম নয়। প্রয়োজন হলে দৌলত বেগ ওল্ডির বিমানঘাঁটিতে সি-১৩০জে সুপার হারকিউলিসের মতো বিরাট সামরিক বিমান যে যখন তখন নামতে পারে, তা-ও সকলকে দেখিয়ে দিয়েছে ভারত। ফলে ওই এলাকায় বাহিনী, সরঞ্জাম এবং রসদ দ্রুত বৃদ্ধি করা ভারতের পক্ষে একেবারেই কঠিন নয়। যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলায় ভারতীয় বাহিনী আপাতত প্রস্তুত বলেই মনে হচ্ছে। আনন্দবাজার পত্রিকা।
পড়া হয়েছে 30 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: শুক্রবার, 05 জুন 2020 12:27

এ বিভাগের সর্বশেষ সংবাদ

ফেসবুক-এ আমরা