09202019শুক্র
শুক্রবার, 15 মে 2015 10:35

প্রশান্ত মহাসাগরে 'বাংলাদেশি দ্বীপ'

ডেস্ক বিশ্ব মানচিত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে একটি বিন্দু। খালি চোখে দেখতে কষ্ট হয়। কিন্তু এটি একটি দেশ, যার নাম পালাও! বাংলাদেশের মানুষের কাছে নামটি শুধু অদ্ভুতই নয়, অপরিচিতও। আয়তন মাত্র ৪৫০ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা মাত্র ১৭ হাজার ৯৪৮। একমাত্র শিল্প পর্যটন। সবচেয়ে কাছের ভূখণ্ড ফিলিপাইনও সাগরপথে ৮৫০ কিলোমিটার। আশপাশে আর কোনো ভূখণ্ড নেই। প্রশান্ত মহাসাগরে একবিন্দু সবুজের নাম পালাও।অবাক করার মতো খবর, এই দেশটিতেই বাস করেন প্রায় এক হাজার ২০০ বাংলাদেশি নাগরিক! এদের প্রায় সবার পরিচয় অবৈধ অভিবাসী। যাদের খবর নিজ দেশ বাংলাদেশও রাখে না। খোদ প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ও জানে না পালাও নামের কোনো দেশে কোনো বাংলাদেশি কর্মী আছে কি-না। যাদের খবর কেউ রাখেনি, তারাই পালাওয়ে উড়িয়েছেন বাংলাদেশের লাল-সবুজের পতাকা। অভিবাসীদের নিয়ে পাঠকেরা বরাবর খারাপ খবর পড়ে অভ্যস্ত। সেখানে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম পালাও। দেশটির জাতীয় ফুটবল লীগে তিনবারের চ্যাম্পিয়ন প্রবাসী বাংলাদেশিদের দল 'টিম বাংলাদেশ এফসি'। ফুটবলে জয়ের গল্পের আগে জেনে নেওয়া দরকার, বাংলাদেশিরা কী করে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কিলোমিটার দূরের পালাও গেল। পালাওয়ের সব বাংলাদেশিকে কলম্বাস বলে ধরে নিতে পারেন। কারণ তারা স্বপ্নের দেশ আমেরিকা ভেবে ভুল করে পালাও গিয়েছিলেন। পালাও এককালে যুক্তরাষ্ট্রের শাসনে ছিল। এখনও দেশটির একমাত্র বৈধ মুদ্রা মার্কিন ডলার। তাই বাংলাদেশের সাধারণ যুবকেরা বুঝতে পারেননি, পালাও আর আমেরিকা এক নয়। আমেরিকা যেতে চেয়ে দালালের খপ্পরে পড়ে তারা চলে যান পালাও।দালাল যতক্ষণে ফিলিপাইন হয়ে পালাও পেঁৗছে দিয়েছে, ততক্ষণে ৮-১০ লাখ টাকা শেষ। আবার যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার সুযোগও নেই। যুক্তরাষ্ট্রের উপনিবেশ গুয়ামের দূরত্ব সাগরপথে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার। তাই প্রতারিত বাংলাদেশিরা ভাগ্যকে মেনে নিয়ে বসবাস শুরু করেন প্রশান্ত মহাসাগরের ঢেউয়ের মুখে বুক চিতিয়ে জেগে থাকা পালাওয়ে। ১৯৯৫ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পালাও গিয়েছিলেন খুলনার আমিনুল ইসলাম। তিনি তখন ২৭ বছরের যুবক। এখন বয়স ৪৭। গত ৬ মে রাতে টেলিফোনে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, পালাওয়ের নানা কাহিনী।২০০৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে আরও প্রায় ১ এক হাজার ২০০ বাংলাদেশি পালাও যান। অবস্থা এমন দাঁড়াল পালাওয়ে তখন প্রতি ১০০ জনে ৮ জনই বাংলাদেশি। এর পর থেকেই দেশটিতে বাংলাদেশের প্রবেশ প্রায় নিষিদ্ধ। ছুটি নিয়ে দেশে ফিরলে পুনঃপ্রবেশও বন্ধ। দ্বীপান্তরের মতো বন্দিজীবন। নেই কাজের নিশ্চয়তা। কাজ পেলেও বদলের সুযোগ নেই। বেতনও যৎসামান্য। পালাওয়েরে গণমাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের 'সুপারি চোর' বলে অভিযোগ করা হয়। গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পালাও সরকার বাংলাদেশি কর্মী আগমনের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এমন প্রতিকূল অবস্থাতে পালাওবাসীর আস্থা অর্জনে ফুটবলকে বেছে নেন বাংলাদেশি কর্মীরা। ২০০৪ সালে গঠিত হয় 'টিম বাংলাদেশ এফসি'। দলটি পালাও ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। দেশটির প্রধান টুর্নামেন্ট 'পালাও সকার লীগ' পৃথিবীর বড় লীগগুলোর একটি নয়। এর খবর বাইরের বিশ্বের কেউ রাখে না। তারপরও বাংলাদেশিদের নিজেদের প্রমাণে বিশাল মঞ্চ। যে বাংলাদেশিরা এতদিন কাঠমিস্ত্রি, নিরাপত্তা রক্ষী, কৃষিকাজ কিংবা হোটেলে বয়-বেয়ারার কাজ করতেন তারাই 'টিম বাংলাদেশ এফসি'-এর খেলোয়াড়। সপ্তাহজুড়ে হাড়ভাঙা খাটুনির পরও পালাও লীগে গত ১০ বছরে তিনবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তারা। সর্বশেষ ২০১২ সালেও চ্যাম্পিয়ন হয় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্থানীয়দের দল তাজ এফসিকে হারিয়ে। ২০০৫ ও ২০০৭ সালেও চ্যাম্পিয়ন হয় টিম বাংলাদেশ।টিমের ম্যানেজার শওকত হোসেন ফেসবুকের মাধ্যমে জানান, দল করতে ১৫ জন খেলোয়াড় দরকার। কিন্তু ১৪ জনের বেশি খেলোয়াড় জোগাড় করতে পারেননি বাংলাদেশিরা। সমস্যার সমাধান হয়, আরেক প্রবাসী শ্রমিক ফিজির মলাইকা বিটুকে দলে নিয়ে। দলের ৭ নম্বর জার্সিধারী নোয়াখালীর মহসিন মিয়া কৃষক থেকে এখন পালাও জাতীয় দলের 'ডিফেন্ডার'। এ কারণে পেয়েছেন পালাওয়ের নাগরিকত্ব।শওকত হোসেন জানান, এখনও সেখানে বাংলাদেশি কর্মীদের মাসিক বেতন মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ ডলার। বাড়িতে টাকা পাঠাতে পারেন না। দেশে যোগাযোগ খুব ব্যয়বহুল। এই যুগেও প্রতি মিনিট ফোনকলে প্রায় এক ডলার খরচ! তার চেয়েও বড় কষ্ট পালাওবাসী 'বাংলাদেশ' শব্দটিই খারাপ চোখে দেখত। তবে ফুটবলের কারণে দৃশ্যপট কিছুটা বদলেছে। পালাওবাসীর কাছে বাংলাদেশ এখন আর ভীতিকর কোনো শব্দ নয়। 'সুপারি চোর' গালিও শুনতে হয় না তাদের। কেউ কেউ শ্রমিক থেকে মালিক হয়েছেন। শওকত জানালেন, এখনও অনেক বঞ্চনা আছে। বাংলাদেশিদের দেখভালের কেউ নেই। বাংলাদেশ সেখানে দূতাবাস খুলবে এমন আশাও নেই। সুযোগ-সুবিধা-নিরাপত্তা দিতে না পারুক, কিন্তু বাংলাদেশ যেন তার এই বারশ' সন্তানের খবর রাখে_ এই একটাই আকুতি তাদের।সমকাল।
পড়া হয়েছে 587 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: শুক্রবার, 15 মে 2015 10:59