10162019বুধ
মঙ্গলবার, 05 এপ্রিল 2016 18:41

ক্যারিবীয় সাম্রাজ্যের পুনর্জন্ম!

মাঠের নাচ, পার্টির উৎসব- সবই হয়েছে আগের রাতে। গতকাল সকালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালসের সামনে বিশ্বজয়ী দুই ক্যারিবীয় অধিনায়ক স্টিফানি ও স্যামি আনুষ্ঠানিকভাবে দাঁড়ালেন শিরোপা হাতে মাঠের নাচ, পার্টির উৎসব- সবই হয়েছে আগের রাতে। গতকাল সকালে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালসের সামনে বিশ্বজয়ী দুই ক্যারিবীয় অধিনায়ক স্টিফানি ও স্যামি আনুষ্ঠানিকভাবে দাঁড়ালেন শিরোপা হাতে
< > ডেস্ক কার্টলি অ্যামব্রোস রাশভারি মানুষ। খুব বেশি কথা বলেন না। তার সম্বন্ধে তো একটাই কথা প্রচলিত আছে- 'কার্টলি টকস টু নো ম্যান!' বিকেলের সোনা রোদে ক্যারিবীয় মেয়েদের মুখে তখন হাসির ঝিলিক। রবিবাসরীয় ইডেনে সবে রূপকথা লিখেছেন তারা। অ্যামব্রোস সেই পড়ন্ত বিকেলে কী করছিলেন? দেখেছেন কেউ? মেয়েরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতেই স্যামি-ব্রাফেটরা মাঠে নেমে তাদের বুকে টেনে নিয়ে উদযাপন করেছেন। 'চ্যাম্পিয়ন্স' নেচেছেন। তাতে কারও আপত্তি থাকতে পারে। ক্যারিবীয়দের নেই। আনন্দে আবার আপত্তি কিসের! আর তিনি, ৫২ বসন্তের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ভয়ঙ্কর ফাস্ট বোলার স্যার কার্টলি অ্যামব্রোসও তাতে যোগ দিয়েছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে তার সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত ছিল ব্যাটসম্যানকে আউট করার পর। সতীর্থদের সঙ্গে হাই-ফাইভ এমন জোরে জোরে করতেন যে দেখে মনে হতো, কী ভয়ানক ক্ষ্যাপাটাই না ক্ষেপে ছিলেন ব্যাটসম্যানের ওপর! সেই তিনি গতকাল বিকেলেও মাঠে নেমে মেয়েদের সঙ্গে তার চিরন্তন কায়দাতেই হাই-ফাইভ করলেন। ক্ষেপে নয়, আনন্দে। আর রাতের ইডেনে তিনি কী করলেন? কোথায় তার হাই-ফাইভ? কার্লোস ব্রাফেটের ব্যাটে ডিজিটগুলো এভাবে লেখা হলো- ৬, ৬, ৬, ৬! বিশ্বজয়! ডাগআউট থেকে ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটাররা উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের ক্ষিপ্রতায় স্যামুয়েলস-ব্রাফেটের ওপর আছড়ে পড়লেন। জীবনের হাফসেঞ্চুরি করে ফেলা ছয় ফুট সাত ইঞ্চি লম্বার মানুষটাও সিকি শতাব্দীর বয়সে নেমে গেলেন। দৌড়! হারিয়ে গেলেন শিষ্যদের সেই ঘূর্ণিপাকের ভিড়ে। কিছুক্ষণ বাদেই তিনি আবারও আবিষ্কৃত। ক্যামেরার সামনে আঙুল দেখাচ্ছেন- অনামিকা, মধ্যমা, তর্জনী! আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৬৩০ বার আম্পায়ারকে তর্জনী ঊধর্ে্ব তুলতে বাধ্য করেছিলেন। টেস্টে ২০.৯৯ গড়ে ৪০৫ ও ওয়ানডেতে ২৪.১২ গড়ে ২২৫ উইকেট। কোর্টনি ওয়ালশের সঙ্গী হিসেবে বানিয়েছিলেন 'ডাবল সি'র বিখ্যাত পেস জুটি। তাতেও বোঝানো যাচ্ছে না হয়তো। এভাবে যদি কিছুটা বোঝানো যায়, ওয়ালশ-লারা-অ্যামব্রোস- সূর্য-সাম্রাজ্যের শেষ ত্রি-প্রতিনিধি, যারা ক্রিকেট ইতিহাসের যে কোনো দলে খেলার ক্ষমতা রাখেন! কিংবদন্তি তারা। স্বর্ণসময়ের শেষ সাক্ষী তারা। অথচ কোনোদিনও বিশ্বকাপ ছুঁয়ে দেখা হয়নি। বিশ্বজয়ী দলের বোলিং কোচ হিসেবে সেই সুখ স্পর্শ করলেন তাদেরই একজন। রাশভারি অ্যামব্রোস উদযাপনে তো তরুণ হতেই পারেন! তবুও তার কি শুধু উদযাপন করলেই হবে? তাই তিনি তিনটি আঙুল দেখালেন! দুটি ট্রফি নিয়ে তো রোববারের বিজয়মঞ্চেই উন্মত্ত শো-ডাউন দিয়ে গেল ক্যারিবীয়দের পুরুষ ও নারী দল। স্বর্ণযুগের স্মৃতিতে ভাস্বর অ্যামব্রোস সেই আনন্দের ভিড়েও 'নতুন শিশু'দের কথা ভুললেন না। গেল অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে আগামীর ক্যারিবীয় ক্রিকেটাররাই তো বিশ্বজয় করে গেছেন বাংলাদেশ থেকে। শামার স্প্রিঙ্গার নামের এক তরুণের 'চেস্ট রোল ড্যান্স' এই জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতেও সবাইকে ছুঁয়ে গেছে। আপনি ভুলতে পারেন ক্যারিবীয় যুবাদের কৃতিত্ব। অ্যামব্রোস কেন ভুলবেন! তাদের কথাই বরং আগে মনে পড়বে তার। তাদের হাতেই সেই আধিপত্যের পুনর্জন্ম হলো না, এর নিশ্চয়তা কে দিল কখন! জগদ্বিখ্যাত 'থ্রি ডবি্লউ'র লোকগাথা পার করে গ্যারি সোর্বাসদের জামানা। এর পরই ক্রিকেটাকাশে আবির্ভূত হবে ক্লাইভ লয়েডের সেই অদ্বিতীয়, অবিসংবাদিত যুগ। কিংবদন্তি 'পেস কোয়াট্রেট', গ্রিনিজ-হেইন্সের উদ্বোধনী জুটি, লয়েডের নেতৃত্ব আর অতি অবশ্যই 'কিং' ভিভ রিচার্ডসের ভয়ঙ্করসুন্দর ব্যাটিং-আধিপত্য। আশির দশকের একদম শেষভাগে যে সূর্য অস্তমিত হলো। ততদিনে ওয়ালশ-অ্যামব্রোস-লারারা চলে এসেছেন। একদিন তারা দেখলেন, সেই ক্যারিবীয় জাত্যাভিমান, সেই ছন্দ, আনন্দ, সেই বিনোদন, সেই মোহমুগ্ধ ক্রিকেটটা হারিয়ে গেছে ক্যারিবীয় দ্বীপ থেকে! নাহ, ক্রিকেটবিশ্বেই অদৃশ্য! ক্যারিবীয় ক্রিকেট হারিয়ে গেলে আসলে ক্রিকেটই হারিয়ে যায়। তার আনন্দালোক, তার রূপকথা, তার ঐতিহ্য, কিংবদন্তি, মহাপ্রাণ এক-একটা চরিত্র হারিয়ে যায়। এই ২০১৬ সালে এসে আজকের প্রজন্ম যে সেই হৃত গৌরবের পুনর্জন্ম ঘটাল না, তা কে বলতে পারে? এটাই তো সেই মহিমান্বিত বছর, যার তিন ভাগের এক ভাগ সময়েই ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ তিনটি উৎসবের বাতিঘর হয়ে জ্বলছে। এক-একটা দ্বীপে জ্বলজ্বল করছে তিনটি প্রদীপ! ক্যারিবীয়রা এখন ট্রেবলজয়ী! ত্রিমুকুটের রাজত্ব তাদের! লেখার এত দূর এসে আসল কথাটা বলি। অ্যামব্রোস নন, আমাদের অভীষ্ট আদতে মহীয়ান এক চরিত্র- ক্লাইভ লয়েড। প্রথম দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক। কালোত্তীর্ণ এক দলের নেতা। স্বর্ণকালের সাক্ষী। অ্যামব্রোসরা যার যুগোত্তীর্ণ সাফল্যের শেষ পরশপাথর। আজও, এই ইডেনেও তিনি সাক্ষী- ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রধান নির্বাচক। অ্যামব্রোস যখন তিনটি আঙুল দেখালেন, তিনি তখন কোথায় ছিলেন? তাকে দেখার বড় সাধ ছিল আমাদের। ক্লাইভ লয়েড- আমাদের এই পুনর্জন্মের ভ্রমণগল্পে আপনিই যে ভীষ্ম পিতামহ! < >
পড়া হয়েছে 480 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: মঙ্গলবার, 05 এপ্রিল 2016 18:50