09282020সোম
শিরোনাম:
শুক্রবার, 01 নভেম্বর 2013 09:25

এখন বাংলাওয়াশের পালা

শামসুর ও রুবেলের হাতে বিজয় পতাকা। নিউজিল্যান্ড-বধ শেষে মুশফিকুরদের বিজয়োত্সব। কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ষ শামসুল হক
নিজস্ব প্রতিবেদক
শামসুর ও রুবেলের হাতে বিজয় পতাকা। নিউজিল্যান্ড-বধ শেষে মুশফিকুরদের বিজয়োৎসব। কাল মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম শামসুল হক ঝাঁকি খাওয়া অফ স্টাম্পটা তখনো পড়েনি। এক দৌড়ে সেটা তুলে নিয়ে মাশরাফির দিকে ছুটলেন মুশফিকুর রহিম। বোলার মাশরাফি ততক্ষণে উদ্বাহু হয়ে প্রায়  পয়েন্টের কাছাকাছি। মাঠের এখানে-ওখানে ছড়িয়ে থাকা ফিল্ডাররাও সব ছুটে আসতে থাকলেন মাশরাফির দিকে। শেষ দৃশ্যের নায়ক যে তিনিই!
বাংলাওয়াশ’ শব্দটা শুনতে শুনতে বিরক্তি এসে যাওয়ার কথা এত দিনে মুশফিকুর রহিমের। যেখানেই যান, এই এক কথা। কিন্তু কালকের পর সম্ভবত বাংলাদেশ অধিনায়কের মস্তিষ্কেও এই বাংলা-ইংরেজি মেশানো শব্দ সংগীতের মাধুর্য নিয়ে গুনগুনাচ্ছে। বাংলাদেশের ২৪৭ তাড়া করতে গিয়ে নিউজিল্যান্ড থেমে গেছে ২০৭ রানে। ৪০ রানের জয় এক ম্যাচ বাকি থাকতে শুধু সিরিজ জয়ই এনে দেয়নি, গোটা দেশকে দেখাচ্ছে আরেকটি ‘বাংলাওয়াশের’ স্বপ্নও।
কাকে দেবেন এই কৃতিত্ব? তামিম ইকবাল, নিউজিল্যান্ডের সামনে ২৪৮ রানের লক্ষ্য দাঁড় করানোয় যাঁর সবচেয়ে বড় অবদান? মাশরাফি বিন মুর্তজা, যাঁর ৩ উইকেট আবারও লিখল দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনের গল্প? মুমিনুল হক, দুবার বল হাতে নিয়ে দুবারই যিনি ব্রেক থ্রু এনে দিলেন? নাকি ‘আসল’ ম্যান অব দ্য ম্যাচ সোহাগ গাজীকে? অ্যান্ডারসনের অমন দুর্দান্ত ক্যাচ নেওয়া মুশফিকুর রহিমকেই বা ভুলে যাবেন কীভাবে? কৃতিত্ব আসলে সবারই। পারফরম্যান্সে দলীয় সংহতির গান না বাজলে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ব্যাটিং উইকেটে ২৪৭ রান করেও জয়োৎসব সহজ ছিল না।

ম্যাচ জেতার আগে ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনাকর অনুভূতি টের পাওয়ার দাবি বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনেক দিনের। এবার সেটা বলতে পারেন সিরিজ জয়ের ক্ষেত্রেও। নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশে পা রাখার আগেই শুরু  হয়ে গিয়ে আরেকটি ‘বাংলাওয়াশের’ আলোচনা। টেস্ট সিরিজ ড্র করাজনিত আত্মবিশ্বাস ওয়ানডে সিরিজের আগে সেটাকে যেন বাংলাদেশ দলের কাছে দেশবাসীর একটা দাবিতেই পরিণত করল। অধিনায়ক মুশফিকও ‘সিরিজটা জিততে চাই’ বলেই শুরু করেছিলেন। এক ম্যাচ বাকি থাকতেই সে স্বপ্নপূরণ আরেকটি ‘বাংলাওয়াশের’ দাবিটাকে করল আরও জোরালো। ম্যাচ জয়ের পর কৃত্রিম আলোর নিচে বাংলাদেশ দলের ল্যাপ অব অনারকে স্বাগত জানিয়ে দেওয়া হাততালিতে কি সেই দাবিই জানাচ্ছিল দর্শকেরা? কিংবা উইকেটের ওপর গিয়ে মাশরাফি যে গ্রাউন্ডসম্যানদের সঙ্গে হাত মেলালেন, সেখানেও থাকতে পারে ‘বাংলাওয়াশের’ জন্য আশীর্বাদ চাওয়ার কোনো কারণ।

১০ মাস পর খেলায় ফিরে প্রথম ম্যাচেই মাশরাফি জানিয়ে দিয়েছিলেন নিজের আগমনী ধ্বনি। কালও ইনিংসের তৃতীয় ওভারে হামিশ রাদারফোর্ডকে বোল্ড করে উৎসবের শুরুটা তাঁর হাত ধরেই। মাত্র ৫ রানেই উদ্বোধনী জুটিতে ভাঙন, এরপর ৪৫ রানের মাথায় আরেক ওপেনার ডেভচিচ আর এলিয়টকে ফেরত পাঠালেন দুই স্পিনার সোহাগ আর রাজ্জাক। ৪৫ রানের মধ্যে ৩ উইকেটের পতনে ২৪৭ রানের লক্ষ্যটাই যেন আরও বড় মনে থাকে নিউজিল্যান্ডের জন্য। রস টেলর-কোরি অ্যান্ডারসনের চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৬১ রান এলেও বাংলাদেশের বোলাররা সেটিকে মরিয়া চেষ্টার বেশি হতে দিলেন না। টিম সাউদিকে বোল্ড করে মাশরাফিই দিলেন তুলির শেষ আঁচড়।

বোলারদের সাফল্য নিয়ে বলতে গেলে বাদ দেওয়া যাবে না কারও কথাই। মাশরাফির শুরুর পর সোহাগ গাজী ক্রমাগত অস্বস্তিতে রেখেছেন নিউজিল্যান্ডের মিডল অর্ডারকে। আর মুমিনুল তো দিনে দিনে বিস্ময়বালকই হয়ে উঠছেন। ব্যাট হাতে মাত্র ৩১ রান করলেও কাল আসল কাজটা করলেন বোলিংয়ে। ৩১তম ওভারে প্রথম বল হাতে নিয়ে ৩ ওভারের স্পেলে মাত্র ৪ রান দিয়ে নিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালামের উইকেটটা। টেলরের সঙ্গে ম্যাককালামের পঞ্চম উইকেটটা মোটামুটি দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল ওই সময়। ৪৬তম ওভারে আবারও বল হাতে নিয়ে আবারও ব্রেক থ্রু! এবার তাঁর বাঁহাতি স্পিনের শিকার আরেক (নাথান) ম্যাককালাম। ব্রেক থ্রু এটাকেও বলতে হবে কারণ দলের ১৫৭ রানে টেলরের বিদা পর ম্যাককালাম-মিলসের নবম উইকেট জুটিতে ততক্ষণে এসে গিয়েছিল ৩৭ রান।

টসে জিতে বাংলাদেশের আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্তটা ইনিংসজুড়েই রহস্য ছড়িয়ে রাখল। এমন নয় যে আগে ব্যাট করে ব্যাটসম্যানরা বিপদে  পড়েছেন। কিন্তু প্রথম ওয়ানডের আগে দুই অধিনা মিলে যেভাবে শিশির-তত্ত্বের আলোচনা তুলে দিয়েছিলেন, তাতে মনে হচ্ছিল এই সিরিজে দিবারাত্রির ম্যাচগুলোয় পরে বল করাটা অপরাধের পর্যায়ে পড়োছলো।

মুশফিক টসে জিতে কাল সেই ‘অপরাধ’টাই করলেন। ব্যাটিং উইকেটই ছিল। আগে ব্যাট করে প্রতিপক্ষকে বড়সড় একটা রানের নিচে চাপা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল সম্ভবত। কিন্তু বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের উচ্চাভিলাষী সব শট সেটা হতে দিল কই!

এনামুলের ব্যাটে রান নেই। কাল তামিমের সঙ্গে ওপেনিং জুটিতে তাই শামসুর। শুরুটা খারাপ ছিল না। তামিম স্বভাবসুলভ বাজে বলে ব্যাট চালাচ্ছিলেন। অন্য পাশে একটু যেন ধরে খেলতে চাইলেন শামসুর। তাতে আগের ম্যাচের তুলনায় ওপেনিং জুটিতে রান এল বেশি, সেটা এমনকি হয়ে গেল বাংলাদেশ ইনিংসেরই সর্বোচ্চ জুটি।

নাথান ম্যাককালামকে ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে ছক্কা মারতে গিয়ে স্টাম্পড হলেন শামসুর, ৬৩ রানের ওপেনিং জুটিটাও ভাঙল। ম্যাককালামের আগের ওভারের চতুর্থ ও পঞ্চম বলে স্কয়ার লেগের ওপর গিয়ে পর পর দুই ছক্কা মেরেছিলেন। আউট হওয়া বলটাতেও সম্ভবত সে রকমই কিছু করতে চেয়েছিলেন অভিষেক ওয়ানডে খেলতে নামা শামসুর। অবশ্য শুধু শামসুরকে দোষ দিলে হবে না, তিনি তো খেলতে নেমেছিলেন প্রথম ওয়ানডে! অভিজ্ঞ তামিম, মুশফিকুর, নাসিররাও উইকেট উপহার দিয়ে আসার বাংলাদেশি রীতি থেকে বের হতে পারেননি। অ্যান্ডারসনকে শামসুরের মতোই ডাউন দ্য উইকেটে গিয়ে মারতে গিয়ে ব্যাটের ভেতরের কানায় বল লেগে বোল্ড তামিম। তবে সান্ত্বনা চার ওয়ানডে পর একটা ফিফটির দেখা পেলেন বাঁহাতি এই ওপেনার।

বাকিদের মধ্যে সর্বোচ্চ রান মুমিনুল আর মুশফিকের ৩১। কিন্তু অমন একটা জয়ের পর এসব সমালোচনা বড়ই অপ্রাসঙ্গিক। বিজয়ে রাতে প্রাসঙ্গিক কেবল আরও বড় কোনো বিজয়ের প্রত্যাশাই। সেটা ‘বাংলাওয়াশ’  নয় কেন?

 

বাংলাদেশ: ৪৯ ওভারে ২৪৭

নিউজিল্যান্ড: ৪৬.৪ ওভারে ২০৭

পড়া হয়েছে 639 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: শুক্রবার, 01 নভেম্বর 2013 10:01