10192018শুক্র
শনিবার, 17 মার্চ 2018 08:19

মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটে ফাইনালে বাংলাদেশ

নিউজ ফ্ল্যাশ ডেস্ক মাহমুদ উল্লাহর ব্যাট ছুঁয়ে যাওয়া বলটি স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে উড়ে শুধু সীমানা দড়ির ওপারেই গিয়ে পড়ল না, সঙ্গে নিয়ে গেল গোটা সিংহল দ্বীপের দ্বীর্ঘশ্বাস। স্বাধীনতার ৭০ বছরকে স্মরণীয় করে রাখতে আয়োজন করা ত্রিদেশীয় সিরিজে স্বাগতিকরাই হয়ে গেল দর্শক। নাটকীয় শেষ ওভারে, ১ বল আর ২ উইকেট হাতে রেখে জিতে গেল বাংলাদেশ। ভারত মহাসাগরের এপারে যখন হতাশা, তখন দূরের বঙ্গোপসাগর তীরে যে উৎসবের জয়ঢাক বাজছে, সেই শব্দের অনুরণন ভেসে আসছে কলম্বোতেও। গ্যালারির বাংলাদেশি সমর্থকদের ছোট্ট দলটাও যে পাগলের মতো নেচে চলছিল! শ্রীলঙ্কার পঞ্চম উইকেট পড়েছিল দলীয় ৪১ রানে, নবম ওভারের প্রথম বলে। বাংলাদেশের পঞ্চম উইকেট পড়ল ১০৯ রানে, ১৪তম ওভারের পঞ্চম বলে। এত অল্পতেই ৫ উইকেট হারিয়েও শ্রীলঙ্কার রানটা ৭ উইকেটে ১৫৯ হলো। কারণ কুশল পেরেরা ও থিসারা পেরেরা ছিলেন। তবে ১৬০ রানের লক্ষ্যেও বাংলাদেশ পৌঁছে গেল। কারণ মাহমুদ উল্লাহ ছিলেন। বেঙ্গালুরুর দুঃস্বপ্নে তিনিও ছিলেন ‘খলনায়ক’দের একজন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আগের ম্যাচটায় শাপমোচন করেছিলেন মুশফিকুর রহিম, কাল জয়ের নায়ক হয়ে উঠলেন মাহমুদ উল্লাহ। শেষ ওভারে জয়ের জন্য ১২ রানের অঙ্ক তিনি মিলিয়ে দিয়েছেন একাই। পরশু সন্ধ্যায় কলম্বো নেমে কালই ম্যাচ খেলতে নেমেছেন সাকিব আল হাসান, ফিরেছেন অধিনায়কের দায়িত্বেও। গুরুত্বপূর্ণ টসটা তিনিই জিতেছেন, নিয়েছেন বোলিং। বল হাতে আক্রমণেও তিনি এসেছেন সবার আগে, দিয়েছেন ব্রেক থ্রু। মুস্তাফিজের প্রথম ওভারটাই ছিল উইকেট-মেডেন, পরের ওভারে ৪ রান দিয়ে পেয়েছেন আরেকটি উইকেট। প্রথম স্পেল শেষে মুস্তাফিজের বোলিং পরিসংখ্যান : ৪-১-৪-২। জীবন মেন্ডিসের উইকেটও তুলে নিলেন মেহেদি হাসান মিরাজ, ওদিকে ভুল বোঝাবুঝিতে রানআউট উপুল থারাঙ্গাও। ৪১ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে শ্রীলঙ্কা, সাপ্তাহিক ছুটি শুরুর আগের রাতের ভরা গ্যালারিতে রীতিমতো পিনপতন নীরবতা তখন। ধীরে ধীরে জাগল গ্যালারি। প্রথমে হাততাই, এরপর ভুভুজেলা, একে একে ব্যান্ড আর ডিজের আঙুলের ইশারায় চটুল দক্ষিণী গানের সুরে। ‘পেরেরা, পেরেরা’ ধ্বনিতে। কুশল পেরেরা আর থিসারা পেরেরা, দুজন শুরুতে খানিকটা সাবধানী হয়ে ঠেকিয়েছেন ধস। তারপর শুরু করেছেন মার! সেই চার-ছক্কাই জাগিয়ে তুলেছে গ্যালারি। শুরুতে আত্মবিশ্বাসে ফুটতে থাকা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দেরও কাঁধ গেছে ঝুলে, চেহারা হয়েছে উদ্ভ্রান্ত। এক রান, দুই রান করে নিয়েই খেলছিলেন দুই বাঁহাতি। ফিল্ডিংটা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সাকিব, বল করাচ্ছিলেন মেহেদি হাসান আর রুবেল হোসেনকে দিয়ে। ১৩ নম্বর ওভারে বল করতে এলেন মুস্তাফিজ। দুই পেরেরা মিলে তাঁর বোলিং পরিসংখ্যানটাকে করে দিলেন খারাপ। আগের দুই ওভারে ৪ রান দেওয়া মুস্তাফিজ ওই ওভারেই দেন ১৮ রান, এক ছয় আর দুই চারে। তিনটা ওভার মাহমুদ উল্লাহ ও সৌম্য সরকারকে দিয়ে করানোর পর ফের বল করতে আসেন মুস্তাফিজ, এবারে থিসারা পেরেরা দুই ছক্কায় তার ৬ বল থেকে নেন ১৭ রান। রুবেল আর সৌম্যকে দিয়েই বাকি ওভারগুলো করিয়ে গেছেন সাকিব, নিজের দুই ওভার বাকি থাকলেও আসেননি বল করতে। এমনকি বিশেষজ্ঞ সিপনার হিসেবে দলে জায়গা পাওয়া নাজমুল হোসেন অপুকে দিয়ে বল করাননি একটি ওভারও। দুই পেরেরা মিলে শ্রীলঙ্কাকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে পৌঁছে দেন ৭ উইকেটে ১৫৯ রানের সম্মানজনক অবস্থানে। ১৬০ রান তাড়ায় বাংলাদেশ শুরুতেই হারায় লিটন দাসের উইকেট। অফ স্টাম্পের বেশ বাইরের বল উড়িয়ে মারতে গিয়ে ৩০ গজ বৃত্তেই দাঁড়ানো ফিল্ডারের হাতে ধরা পড়েন। লিটনের বিদায়ে সাব্বির ক্রিজে এসে পর পর দুই বাউন্ডারিতে ইনিংস শুরু করলেও খুব বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারেননি। আকিলা ধনঞ্জয়ের বলে ডাউন দ্য উইকেটে মারতে এসে স্টাম্পড হয়ে যান ১৩ রান করা সাব্বির। তৃতীয় উইকেটে মুশফিক আর তামিম যখন ব্যাট করছিলেন, তখন জয় মনে হচ্ছিল হাতের নাগালেই। ১৩ ওভার শেষে দলের রান ১০০, শেষ ৪২ বলে জিততে চাই ৬০ রান, টি-টোয়েন্টিতে এসব রোজকার ডাল-ভাত। কিন্তু দলটা যে বাংলাদেশ! তাদের ‘ব্র্যান্ড কমিটমেন্ট’-এর ভেতর আছে অনিশ্চয়তা, যাতে হৃদকম্প বাড়ে, রক্তচাপ বাড়ে, বাড়ে স্নায়ুর চাপ। হাফসেঞ্চুরি হতেই তামিমের বিদায়, মুশফিকও সোজা ক্যাচ তুলে দিলেন কাভারে। সৌম্য সরকার ডাউন দ্য উইকেটে এসে মারতে গিয়ে ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে। সাকিবও পারেননি ব্যাট হাতে ম্যাচটা শেষ করে আসতে। স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে ফিরে আসেন ৯ বলে ৭ রান করে। শেষ ওভারটায় বাংলাদেশ যখন ঢুকছে, তখন জয়ের জন্য ৬ বলে লাগে ১২ রান। আগের ওভারের শেষ বলে সিঙ্গেল নিতে গিয়ে রানআউট হয়েছেন মেহেদি হাসান, তার মানে স্ট্রাইকে নতুন ব্যাটসম্যান মুস্তাফিজুর রহমান। নন-স্ট্রাইকে মাহমুদ উল্লাহ। তাঁকে ঘিরেই শেষ আশা। শেষ ওভারের প্রথম বলটি বাউন্সার, মুস্তাফিজ ব্যাটে-বলে করতে পারলেন না। পরের বলও বাউন্সার, হলেন রানআউট। তবে ওই বলটি ‘নো’ ছিল কি না এ নিয়ে তর্ক, সাকিব তো মাঠ ছেড়ে চলেই আসতে বলছিলেন দুই ব্যাটসম্যানকে। কিন্তু থেকে গেলেন মাহমুদ উল্লাহ, চোয়াল চাপা প্রতিজ্ঞায়। ইসুরু উদানার পরের বলটা হাঁটু গেড়ে কাভারের ওপর দিয়ে চার মেরে সমীকরণটা কমিয়ে আনলেন ৩ বলে ৮ রানে। পরের বলে নিলেন দুই রান। স্ট্রাইক রাখলেন নিজের কাছে। পঞ্চম বলটা ফ্লিক করে ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারতেই নিশ্চিত হয়ে যায় বাংলাদেশের জয়। যে জয় বাড়ায় সিংহল দ্বীপের দীর্ঘশ্বাসও।
পড়া হয়েছে 171 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: শনিবার, 17 মার্চ 2018 08:26