11142019বৃহঃ
বুধবার, 15 জুলাই 2015 10:12

বৃক্ষমেলা ও প্রকৃতি প্রেমীদের ‘গল্প’

নিজস্ব প্রতিবেদক এত ছোট গাছে আম ধরে! চোখ বড় বড় করে বলছিল এক বাচ্চা মেয়ে। পাশের গাছে হাত দিয়ে যেন অবাক সে। আরে বাহ্! লাল টুকটুকে ডালিম ধরে রয়েছে দেখি। খানিক দূরে দৌড়ে গিয়ে আরেক গাছের পাশে দাঁড়িয়ে বললো, এত্ত বড় পেয়ারা! দেখো বাবা, আকার দেখে মনে হচ্ছে গাছের চাইতে ফল বড়। মেয়ে ক্লাস ফোরের ছাত্রী আরিবার বিস্ময় দেখে বেশ মজা পাচ্ছিলেন মা-বাবা। তবে তারাও বেশ অবাক। ঠিকই তো এতো ছোট ছোট গাছে ফল ধরে রয়েছে। অবাক করা ঘটনাই তো! শহুরে মানুষদের মুখে এমনই বিস্ময় হয়ে দেখা দিয়েছে জাতীয় বৃক্ষ ও পরিবেশ মেলা ২০১৫। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে বাণিজ্য মেলার মাঠে চলছে মাসাধিককালব্যাপী এই বৃক্ষমেলা। আজ বুধবার মেলার শেষ দিন। গত ৬ জুন থেকে বৃক্ষমেলা চললেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করেন। এবারের শ্লোগান: ‘পাহাড় সমতল উপকূলে, গাছ লাগাই সবাই মিলে।’ রাজধানীতে প্রতিবছরই জাতীয় বৃক্ষমেলা শহরের মানুষদের কাছে সবুজ প্রাণের হাতছানি নিয়ে উপস্থিত হয়। কানাডার জাতীয় পরিবেশ এজেন্সির একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে: ‘গড়পড়তায় দুটি পরিপূর্ণ বৃক্ষ যে অক্সিজেন সরবরাহ করে, তা চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট।’ তাই নির্দ্বিধায় স্বীকার করতেই হবে বৃক্ষের মতো উপকারী বন্ধু-আত্মীয় হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো পৃথিবীতে আর কেউ নেই। বৃক্ষমেলায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে তাই মন ভালো হয়ে যায়। সারি সারি স্টল। স্টলের সামনে সাজানো শত শত গাছ। সেইসব গাছের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে ঘুরে গাছ কিনছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এ মেলায় ৬৫টি প্রতিষ্ঠানের ৮৭টি স্টল অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি নার্সারি ৬১টি, সরকারি ১৫টি, এনজিও একটি ও অন্য ১০টি স্টল। মেলায় প্রতিটি স্টলেই রয়েছে বাহারী বৃক্ষের চারা। দোকানিরা জানালেন, প্রতিবছর তারা এ মেলায় পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার গাছ বিক্রি করেন। মেরুল-বাড্ডা থেকে মেলায় এসেছেন ব্যবসায়ী সৌম্য আরেফিন। ছাদে রাখার জন্য ফলের গাছ কিনেছেন তিনি। বললেন, ‘ঢাকা শহরটা তো গাছহীন হয়ে গেছে। তাই বাড়ির ছাদে কিছু গাছ রাখতে চাই। তাছাড়া পছন্দের দুইটা ক্যাকটাসের চারা কিনলাম।’ মেলার ভিতরের পরিবেশ বেশ ভালো বলে মত দেন তিনি। এদিকে এই মেলা সারাদেশের মানুষের মাঝেই বেশ আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন প্রকৃতি বিষয়ক পেজের সদস্যরাও এই বৃক্ষমেলাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় এসে জড়ো হয়েছেন। এ প্রসঙ্গে নওগাঁ জেলায় কর্মরত সরকারি কর্মচারি জাকিয়া আক্তার জুঁই বললেন, ‘সব গাছ তো জেলা শহরগুলোতে পাওয়া যায় না। তাই এ বৃক্ষমেলার সময় ঢাকায় আসি। আমাদের গ্রুপের অনেক সদস্যই আসেন এসময়। নিজেদের মধ্যে গাছ নিয়ে আলোচনা হয়। ভিন্নধর্মী একটা গ্রুপ। ভালো লাগে।’ এ প্রসঙ্গে বন বিভাগের ঢাকা সদর রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার মনিরুজ্জামান জানান, বৃক্ষমেলা প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৯৫ সালে দিনাজপুরে। এরপর থেকে নিয়মিতভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। শুধু ঢাকার জাতীয় বৃক্ষমেলাই নয়, প্রতিটি জেলা, উপজেলা পর্যায়ে বন বিভাগ নিয়মিত বৃক্ষমেলার আয়োজন করে থাকে। এতে মানুষ গাছ লাগানোর ব্যাপারে যেমন সচেতন হয়ে উঠছে তেমনি নতুন নতুন গাছ লাগানোর প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। হরেক রকম গাছ: মেলায় ঘুরে দেখা যায় বাহারী সব বৃক্ষের সমাহার। শোভাবর্ধক, ফলদ, বনজ, ঔষধি ও জলজ বৃক্ষ নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করেছে প্রায় অর্ধশতাধিক নার্সারী। শোভাবর্ধক বৃক্ষ সাধারণত ঘর, অফিস, হোটেল বা অন্যান্য স্থাপনা সাজানোর জন্য ব্যবহার হয়। শোভাবর্ধক বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে প্যাগোড, বিভিন্ন রকমের ক্যাক্টাস, সাইকাস লাউ, পাতা লতা, এথনোরিয়াম, বিভিন্ন রকমের বনসাঁই, ফিছুদিয়া পাম, কুচিয়াবল, মুনস্টার, বিচিত্র ড্রেসিনা, বনঝাউ, নদীঝাউ অন্যান্য। পপি নার্সারীর বিক্রেতা রহমান বলেন, ‘বেচাবিক্রি আশানুরূপ ভালো হয়েছে। তবে প্রচারের অভাব ছিল। মেলা সঠিক সময়ে উদ্বোধন করতে পারলে বেচাবিক্রি আরো ভালো হতো।’ ঔষধি গাছ নিয়ে এসেছে ডজনখানেক নার্সারী। এসব গাছের মধ্যে রয়েছে দারুচিনি, জাকের আন্দা, আলু বেড়া, পোলাউ পাতা, মিশ্র মশলা, পাথরকুচি, অরহর, উলটকম্বল, আকন্দ, বামতুলসী, তুলসী, সজিনা, পুদিনা, চন্দন, তমাল, নাগেশ্বর, অর্জুন, শিমুল, হরতকী, রেইন্ট্রি, চই, ছাতিয়ান, নাগলিংগম, উলট চন্ডাল, কাঠ বাদাম ইত্যাদি। দাম ক্রেতাদের হাতের নাগালে ছিল বলে দাবি করলেন পুষ্পকানন এন্ড ইকবাল নার্সারীর বিক্রেতা সোহেল রানা। এছাড়া এলাচি লেবু, জামরুল, মিষ্টি করমচা, আনারস, ডালিম, লটকন, আঙ্গুর, মিশরী ডুমুর, কামরাঙ্গা, বিভিন্ন রকমের পেয়ারা, হরেক রকমের বরইসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের নানা মৌসুমের ফলদ বৃক্ষের চারা ও কলম নিয়ে এসেছে উত্তরা ভাই ভাই নার্সারি, অনুভব নার্সারি, বরিশাল নার্সারি, বিএলএফ নার্সারি, পটুয়াখালী নার্সারি, অমনি কনস্পে নার্সারি, মানিকগঞ্জ নার্সারি, রাশিদা নার্সারিসহ অর্ধশতাধিক নার্সারি। মেলায় সরকারি প্রতিষ্ঠান: মেলায় বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিক্রি ও প্রদশর্নীকে কেন্দ্র করে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ ১৫টি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কেন্ট, কেইট, আমেরিকান পালমাল, বৈশাখী, চৌফলা, ত্রিফলা, হাঁড়িভাঙ্গা, মাহালিশা, ফিলিপাইন সুপারসুইট, বারি হাইব্রিড-৪, থাই কাঁচামিঠা, সিন্দুরীসহ দেশি ও বিদেশি ২৯ প্রজাতির আমসহ ২৭ জাতের ফলের কলম, ৩৩ প্রজাতির ফলের চারা, ৪৯ প্রজাতির ফুলের কলম, ১৭ প্রজাতির ফুলের চারা, ১৩ প্রজাতির ওষধি চারা নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন। এসব গাছের চারা বা কলমের দাম ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রেতা শেখ ওহিদুর রহমান বলেন, ‘মেলা দেরিতে উদ্বোধন হলেও পুরো মাসজুড়ে বিক্রি-বাট্টায় কোন ঘাটতি ছিল না। যেদিনটিতে কম বিক্রি হয়েছে সেদিনও ৩০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি করেছি। আমরা গাছের সঠিক জাত নিশ্চিত করি বলে ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে কিনছেন।’ এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. গোলাম মোর্শেদ বলেন, মাসব্যাপী এ মেলায় তারা আগ্রহীদের বাড়ির ছাদে বাগান করার পদ্ধতি, গাছের রোগবালাই দমন পদ্ধতি, একটি বাড়ি, একটি খামার তৈরি করা সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করছেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কৃষকদের নতুন কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানো হচ্ছে এ প্রতিষ্ঠানের স্টলে। এছাড়া রাবার চাষ, সংগ্রহ ও ব্যবহারের নানা প্রদ্ধতি প্রদর্শনী করা হয়েছে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশনের স্টলে। কঞ্চি কলম পদ্ধতিতে বাঁশ চাষের নানা পদ্ধতি প্রদর্শন করা হয়েছে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের স্টলে। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আজিজুল হক বলেন, কঞ্চি কলম সংগ্রহ, বালির বেড তৈরি, বেডে কঞ্চি কলম রোপণ, কলম স্থানান্তর এবং পুনরায় রোপণের নানা নমুনা মেলায় প্রদর্শন করা হয়েছে। আগ্রহীরা এসব প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখেছেন, চাষ পদ্ধতি সম্পর্কে জানছেন এবং অনেকে নিজে চাষ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। ‘গাছ লাগাই সবাই মিলে’: মানুষের মনে গাছের প্রতি এই ভালোবাসা থাকলেও বাংলাদেশে বনাঞ্চল কিন্তু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। ‘দাঁত থাকতে যেমন মানুষ দাঁতের মর্যাদা বোঝে না’ -জাতি হিসাবে আমরাও তা বুঝিনি। ফলে বন উজাড় হয়েছে আর জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৫০ সালে বায়ু মণ্ডলে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০০ কোটি মেট্রিক টনেরও কম, আর বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬০০ কোটি ৪৬৫ মেট্রিক টনেরও বেশি। গত ১০০ বছরে বায়ুমণ্ডলের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ০.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী ৬০-৭০ বছরের মধ্যে পৃথিবীর তাপমাত্রা গড়ে ৪.০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হতে ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া একটি দেশের মূল ভূ-খণ্ডের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশে রয়েছে মাত্র ১০ ভাগ। গ্রামীণ বনায়ন রয়েছে ৭ ভাগ। ফলে দেশের পরিস্থিতি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের রিসার্চ অফিসার মাহবুবুর রহমান জানান, গাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেয় না। বাংলাদেশে ঘনবসতিকে মাথায় রেখে আমাদের বনায়ন কার্যক্রমে আরো বেশি জোর দেয়া প্রয়োজন। বৃক্ষ ধ্বংস মানে প্রাণ ধ্বংস: ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি বৃক্ষ মানবসমাজকে কতটা আর্থিক সুবিধা দেয়, তার একটা হিসাব তুলে ধরে বলছেন, ‘বায়ু দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে ১০ লাখ টাকার, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় ৫ লাখ টাকার, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় ৫ লাখ, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরাশক্তি বাড়িয়ে বাঁচায় ৫ লাখ, গাছে বসবাসকারী প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় ৫ লাখ, আসবাবপত্র ও জ্বালানি কাঠসহ ফল সরবরাহ করে ৫ লাখ টাকার এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য জোগান দিয়ে বাঁচায় আরো ৪০ হাজার টাকা।’ অথচ আমরা সেই গাছকেই কাটছি নির্বিচারে। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যি, প্রতি বছর পৃথিবী থেকে ৩২ মিলিয়ন একর বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনাঞ্চল। সেই হিসাবে প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে প্রায় আট হেক্টর বনভূমি। বাংলাদেশেও বনভূমি উজাড় হচ্ছে। ভূমিদস্যুরা দখল করছে। নগরায়নের কারণে বিলীন হচ্ছে গাছ। এমনকি আন্দোলনের নামেও উজাড় হচ্ছে গাছ। সরকারি হিসাব মতে, হরতাল-অবরোধে গত বছর ১৪ হাজার ২৭০টি বৃক্ষ নিধন করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের তথ্য মতে, রাজনৈতিক সহিংসতায় ২০১৩ সালের মার্চ, মে, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে সারাদেশে নিধন হয়েছে ৬৩ হাজার ৯০০ বৃক্ষ। এতে সারাদেশের পরিবেশগত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা।
পড়া হয়েছে 692 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বুধবার, 15 জুলাই 2015 10:26

ফেসবুক-এ আমরা