08232019শুক্র
শুক্রবার, 17 মার্চ 2017 13:27

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন : সর্বদাই যিনি সবার মনোযোগের কেন্দ্রে

তোফায়েল আহমেদ ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু জন্মেছিলেন এই বাংলার মাটিতে। এই দিনটি যদি বাঙালি জাতির জীবনে না আসত তাহলে আজও আমরা পাকিস্তানের দাসত্বের নিগড়ে আবদ্ধ থাকতাম। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিলেন। ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। আমৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য, দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধুর একান্ত সানি্নধ্যে থেকে দেখেছি তার কৃতজ্ঞতাবোধ, বিনয়, মানুষের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা। স্বদেশে কিংবা বিদেশে সমসাময়িক নেতা বা রাষ্ট্রনায়কদের তেজোময় ব্যক্তিত্বের ছটায় সম্মোহিত করা, উদ্দীপ্ত করার এক আশ্চর্য ক্ষমতা ছিল বঙ্গবন্ধুর। সহায়তা করতেন। এর মধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিরোধী দলের প্রতিপক্ষীয় লোকজনও ছিলেন। কিন্তু শর্ত ছিল, যাদেরকে অর্থ সাহায্য দেওয়া হচ্ছে তাদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখতে হবে। বঙ্গবন্ধু কখনোই মানুষের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলতেন না। তার রাজনৈতিক বক্তব্য ছিল মার্জিত। কখনোই ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রাধান্য দিতেন না। বঙ্গবন্ধুর সময়ানুবর্তিতা, নিয়মানুবর্তিতা ছিল অসাধারণ। ঘড়ি ধরে অনুষ্ঠানাদিতে যেতেন। দলের নেতাকর্মী সবার প্রতি ছিল গভীর মমত্ববোধ। তাদের কাজের মর্যাদা দিতেন, ভালোবেসে বুকে টেনে নিতেন। অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল অপরিসীম। এক মুহূর্তে মানুষকে আপন করে নেওয়ার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তার। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে ১৪ জানুয়ারি আমাকে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় মাত্র ২৯ বছর বয়সে রাজনৈতিক সচিব হিসেবে নিয়োগ করেছিলেন। প্রতিদিন সকালে ৩২ নম্বরে যেতাম। একসঙ্গে অফিসে যেতাম। আবার বঙ্গবন্ধুকে ৩২-এ রেখে নিজের বাসায় ফিরে আসতাম। তিনি শুধু বাংলাদেশেরই নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত আন্তর্জাতিক নেতা। বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হিসেবে বহু দেশে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। যেখানেই গিয়েছিলেন সেখানেই তিনি আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ১৯৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা সফরের কথা। বিমানবন্দরে যখন অবতরণ করলেন, সেকি অভূতপূর্ব দৃশ্য! ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা দুর্গাপ্রসাদ ধর, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় বিমানবন্দরে তাকে অভ্যর্থনা জানালেন। বঙ্গবন্ধুকে বিমানবন্দর থেকে সড়কপথে নেওয়া যায়নি। কারণ তাকে একনজর দেখার জন্য রাজপথে লাখ লাখ মানুষ। হেলিকপ্টারে করে রাজভবনে নেওয়া হয়েছিল। বিকেলে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ২০ লক্ষাধিক লোকের মহাসমাবেশে বক্তৃতায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন- 'আপনারা আমার মানুষকে আশ্রয় দিয়েছেন, খাদ্য দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। আপনাদের কাছে আমি ঋণী। কিন্তু আমার তো দেবার কিছু নাই। আমি তো রিক্ত, নিঃস্ব!' কবির ভাষায় হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারণ করলেন- 'রিক্ত আমি নিঃস্ব আমি দেবার কিছু নাই, আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই।' তারপর রাজভবনে শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছিলেন, 'আমি ভারতের কাছে ঋণী। মুক্তিযুদ্ধে আমাকে অর্থ, অস্ত্র, আশ্রয়সহ সার্বিক সাহায্য দিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে আমি ঋণী। আমি আপনাকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানাই। আপনি যাবেন বাংলাদেশে ১৭ মার্চ, যেদিন আমার জন্মদিন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি চাই, আপনি বাংলাদেশে যাওয়ার আগে আপনার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়ে আসবেন।' শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী ১৭ মার্চ বাংলাদেশে এসেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসমুদ্রে বক্তৃতা করেছিলেন। তার আগেই ১২ মার্চ বিদায়ী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতে ফিরে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য ৬ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে '৭২-এর ১ মার্চ গিয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নে। সেদিন সোভিয়েত রাষ্ট্রপতি নিকোলাই পোদর্গনি, কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক লিওনিদ ইলিচ ব্রেজনেভ, প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই কোসিগিন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো ক্রেমলিনে বঙ্গবন্ধুকে নজিরবিহীন অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। '৭৩-এর ২৭ জুলাই মার্শাল টিটোর আমন্ত্রণে গিয়েছিলেন যুগোশ্লাভিয়া। বঙ্গবন্ধু যখন বেলগ্রেড বিমানবন্দরে অবতরণ করেন, তখন তাকে যুগোশ্লাভিয়ার প্রধানমন্ত্রী জামাল বিয়েদিস অভ্যর্থনা জানালেন। দ্বিপক্ষীয় বৈঠক শেষে নিয়ে যাওয়া হলো বিরোনি দ্বীপে, যেখানে মার্শাল টিটো অবস্থান করতেন। সেই দ্বীপে মার্শাল টিটো বিমানবন্দরে এসে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানান। একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য একটি দেশের রাষ্ট্রপতির অভ্যর্থনা জ্ঞাপন বিরল। জুলাইয়ের ৩১ তারিখে আমাদের গন্তব্য ছিল কানাডার রাজধানী অটোয়ায়, কমনওয়েলথ সম্মেলন। বাংলাদেশ তখন কমনওয়েলথের নবীনতম সদস্য। সেখানে কানাডার প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন। বিশ্বের অনেক বরেণ্য নেতা কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। আজও বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণের কথা আমার মনে পড়ে। তিনি বক্তৃতার এক পর্যায়ে বলেছিলেন- 'হোয়েন এলিফ্যান্ট প্লেস ইট ইজ দি গ্রাস হু সাফারস।' বঙ্গবন্ধুর এ বক্তব্য সম্মেলনে আলোড়ন তুলেছিল। বৃহৎ শক্তিকে লক্ষ্য করে তিনি এ উক্তি করেছিলেন। জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে যোগদানের উদ্দেশ্যে '৭৩-এর ৬ সেপ্টেম্বর ৪ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বঙ্গবন্ধু আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে পেঁৗছেন। ৯ সেপ্টেম্বর বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'বিশ্ব আজ দু'ভাগে বিভক্ত- শোষক আর শোষিত; আমি শোষিতের পক্ষে।' একই বছর অক্টোবরের ১৭ তারিখ ৭ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে বঙ্গবন্ধু জাপান গমন করেন। সেখানেও অভূতপূর্ব দৃশ্য। অর্থাৎ বিশ্বের মানুষের চোখে বঙ্গবন্ধু এক মহান নেতা ছিলেন। ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশকে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যরূপে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হয়। অধিবেশনে যোগ দিতে ২৩ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ বিমানের লন্ডন ফ্লাইটে আমরা ঢাকা ত্যাগ করি। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে সদ্য সদস্য পদপ্রাপ্ত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা। বক্তৃতা প্রদানের জন্য বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষিত হয়, তখন বিশ্বনেতৃবৃন্দের মুহুর্মুহু করতালিতে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চতুর্দিকে তাকিয়ে পরিষদে সমাগত বিশ্বনেতৃবৃন্দকে সম্বোধন করে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সর্বোচ্চ সংস্থা জাতিসংঘকে 'মানব জাতির মহান পার্লামেন্ট' উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতা শুরু করেন। জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতায় বলেছিলেন, 'শান্তি ও ন্যায়ের জন্য পৃথিবীর সব মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা বিমূর্ত হয়ে উঠবে, এমন এক নয়া বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশ আজ পূর্ণ অঙ্গীকারবদ্ধ।' মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু ইরাক সফরে যান। ইরাকের প্রেসিডেন্ট হাসান-আল-বাকার এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন বঙ্গবন্ধুকে সম্মানিত করেন। সারাক্ষণ সাদ্দাম হোসেন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন। '৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট হুয়ারে বুমেদিনের বিশেষ বিমান নিয়ে পাঁচজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে ওআইসি সম্মেলনে নেওয়ার জন্য। ২৩ ফেব্রুয়ারি যখন আমরা ওআইসি সম্মেলনে যোগদান করি, সেখানেও বঙ্গবন্ধু ছিলেন সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গবন্ধু খুব আত্মমর্যাদাশালী নেতা ছিলেন। জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে কিউবার রাষ্ট্রপতি ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে আলিঙ্গন করে বলেছিলেন, 'আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।' সৌদি আরবের বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বলেছিলেন, 'আমি আপনার কাছে স্বীকৃতি চাইতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাকে সম্মান জানাতে। স্বীকৃতি না দিয়েও আপনি আমার বাংলাদেশের মানুষকে হজব্রত পালনের সুযোগ দিয়েছেন। এ জন্য আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।' আজ এই মহান নেতার জন্মদিনে শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাকে স্মরণ করি। আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তার স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং স্বাধীন বাংলাদেশকে সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। তাই তো তিনি ৭ মার্চে বলেছিলেন- 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' তিনি স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি দিয়ে যেতে পারেননি। সেই দায়িত্বটা নিয়েছেন তার সুযোগ্য কন্যা আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে অর্থনৈতিক মুক্তির পথে। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, বাণিজ্যমন্ত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এই ইমেইল ঠিকানাটি spambots থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। এটি দেখতে হলে আপনার জাভা স্ক্রিপ্ট সক্রিয় থাকতে হবে।
পড়া হয়েছে 375 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: শুক্রবার, 17 মার্চ 2017 23:58