08232019শুক্র
বৃহস্পতিবার, 29 সেপ্টেম্বর 2016 22:04

এই ধরনের সার্জিক্যাল অপারেশন আরও আগে দরকার ছিল

নিখিলেশ রায়চৌধুরী অধিকৃত কাশ্মীরে দুর্ধর্ষ সার্জিক্যাল স্ট্রাইকে অন্তত ৩৫ জন লস্কর জঙ্গিকে খতম করে দিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্স৷ সন্ত্রাসবাদীদের অন্তত সাতটি ঘাঁটি তারা ধ্বংস করে দিয়েছে৷ বলা বাহুল্য, জঙ্গি ঘাঁটিতে প্রশিক্ষক হিসাবে একাধিক পাক সেনা অফিসারও ছিলেন৷ তাঁরাও মরেছেন৷ অনেক দিন আগেই এই ধরনের হট পারস্যুট টাইপ কমান্ডো অপারেশনের দরকার ছিল৷ কারণ, অধিকৃত কাশ্মীরে পাকিস্তানি সামরিক গুপ্তচর বাহিনী ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) পরিচালনায় জঙ্গি শিবির চলার ঘটনা নতুন ব্যাপার নয়৷ এ নিয়ে বহু আগে থেকেই অসংখ্য তথ্যপ্রমাণ ভারত পাকিস্তানকে বারংবার দিয়েছে৷ এমনকী, আন্তর্জাতিক স্তরেও তা তুলে ধরেছে৷ মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছে৷ কিন্তু উলটো দিক থেকে কোনও ইতিবাচক সাড়া মেলেনি৷ লস্কর-ই-তোইবার প্রধান হাফিজ মহম্মদ সইদের সন্ত্রাসবাদী ভূমিকা নিয়ে ভারত যখন প্রথম আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ জানিয়েছিল সেই সময় মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশ ছাড়া কেউই তার কথায় কর্ণপাত করেনি৷ মার্কিন প্রশাসনের কালো তালিকায় হাফিজ মহম্মদ সইদ ঢুকেছে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকার মাটিতে আত্মঘাতী হামলার পর৷ কিন্তু তার পরেও কোনও লাভের লাভ হয়নি৷ মার্কিন প্রশাসনের তর্জনগর্জনে খাতায়-কলমে লস্কর-ই-তোইবা নিষিদ্ধ হয়েছে বটে, কিন্তু ‘জামাত-উদ-দাওয়া’ নামে তারা তাদের ভারতবিরোধী কার্যকলাপ অবাধে চালিয়ে গিয়েছে৷ ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বই হামলার পরেও লস্করের বিরুদ্ধে কোনও উপযুক্ত পদক্ষেপই পাকিস্তান নেয়নি৷ এই সেদিনও ভিডিওয় দেখা গিয়েছে, হাফিজ মহম্মদ সইদ বহাল তবিয়তে অধিকৃত কাশ্মীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ ভারত-বিরোধী জিগির তুলছে৷ এখনও পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর এই সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে মার্কিন প্রশাসন প্রতিক্রিয়া জানায়নি৷ যদিও কোনও দেশে যে কোনও ধরনের মার্কিন-বিরোধী শক্তি তৎপর বলে মনে করলেই আমেরিকার সেনাবাহিনী এ ধরনের কমান্ডো অভিযান বহুকাল আগে থেকেই চালিয়ে এসেছে৷ তা সেই ‘মার্কিন-বিরোধী’রা প্রকৃত জাতীয় মুক্তিকামী আন্দোলনকারীই হোক, কিংবা সন্ত্রাসবাদীই হোক৷ নিক্সন-কিসিঞ্জারের আমলে এমনও ঘটেছে যে, এহেন সামরিক সার্জিক্যাল স্ট্রাইক নিয়ে খোদ মার্কিন কংগ্রেস এবং প্রশাসনের সবাইকেও ঘুণাক্ষরে কিছু জানানো হয়নি৷ বরং পর্দাফাঁস হওয়ার আগে পর্যন্ত এই ধরনের অপারেশন হয়নি বলেই ক্রমাগত দাবি করা হয়েছে৷ একবার হর্ন অফ আফ্রিকা সোমালিয়ায় সেখানকার যুদ্ধবাজ উপজাতি নেতা আইদিদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অপারেশন চালাতে গিয়ে মার্কিন মেরিন ব্যর্থ হওয়ায় তা নিয়ে ঢি ঢি পড়ে গিয়েছিল৷ কিন্তু এমন অনেক সার্জিক্যাল কমান্ডো অভিযানই আমেরিকা চালিয়েছে যা পরবর্তীকালে তারা না-জানানো পর্যন্ত কাকপক্ষীও টের পায়নি৷ তা সে চে গেভারা হত্যা অভিযানই হোক কিংবা লাদেন খতম অভিযানই হোক৷ ক্যারিবীয় দ্বীপরাষ্ট্র গ্রেনাডায় তো মার্কিন মেরিনরা একেবারে নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সেদেশের নেতা মরিস বিশপ সহ গোটা সরকারি কর্তৃপক্ষকেই খতম করে দিয়েছিল৷ যদিও তার আগে মরিস বিশপ আমেরিকার মাটিতে কোনও নাশকতা, নরহত্যা কিংবা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাচ্ছিলেন বলে জানা যায়নি৷ বরং ক্ষমতায় আসার পর ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন৷ এমনকী, ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সেদেশে গিয়ে মরিস বিশপের নিমন্ত্রণও রক্ষা করেছিলেন৷ ইন্দিরা গান্ধীর আমল থেকেই অধিকৃত কাশ্মীরে ভারত-বিরোধী সন্ত্রাসবাদী শিবির খুলে বসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী৷ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়া উল-হকেরই ব্রেন চাইল্ড ছিল ভারতের ক্রমাগত রক্তক্ষরণের গেমপ্ল্যান ‘অপারেশন টোপাজ’৷ আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম থেকে শুরু সেদেশের প্রশাসনেও দীর্ঘদিন ধরে একটা জোক চালু আছে৷ পাকিস্তান দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনটি A-এর উপর৷ আল্লা, আর্মি, আমেরিকা৷ সুতরাং, অপারেশন টোপাজ সম্পর্কে ল্যাংলি-র সিআইএ কর্তারা তখন কিছুই জানতেন না, এ হতে পারে না৷ বরং, তখন তারা এ ব্যাপারে পাকিস্তানের জঙ্গিশাহিকেই উৎসাহ জুগিয়েছিলেন৷ যত দিন না আমেরিকার প্রশাসনের নিজের স্বার্থে আঘাত লেগেছে তত দিন তারা পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী ভূমিকা নিয়ে নড়ে বসেনি৷ শুধু তাই নয়, আপন স্বার্থে আঘাত লাগার পরেও তার অভিমুখ মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছেন৷ সেই অভিমুখ আর কোন দিকেই বা ঘুরবে? অবশ্যই ভারতের দিকে৷ 9/11-এর পর নর্দার্ন অ্যালায়েন্স যখন আফগানিস্তানে ঢুকেছিল তখন কালা-ই-জাংঘি বলে একটি তালিবানি ঘাঁটিতে মাঝপথে যুদ্ধ থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল৷ তার কারণ, সেই দুর্গে আটকে পড়েছিলেন এক মার্কিন সিআইএ অফিসার এবং দুই পাকিস্তানি আইএসআই কমান্ডার৷ বেইমানি করা হয়েছে এই রাগে সিআইএ অফিসারকে তালিবানিরাই খতম করে দেয়৷ তবে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে পাক আইএসআই অফিসারদের উদ্ধার করা হয়৷ সন্ত্রাস লালনে পাক সেনাবাহিনী তথা আইএসআইয়ের ভূমিকাটা কী, তা প্রতি ইঞ্চিতে জানা সত্ত্বেও মার্কিন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা যখন বরাবরই দুমুখো নীতি নিয়ে চলার পক্ষপাতী তখন পাক-মদতপুষ্ট জঙ্গিদের বিরুদ্ধে এ ধরনের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ছাড়া ভারতের সামনে আর কোনও রাস্তাই বা খোলা ছিল? আবারও বলতে হচ্ছে, এই ধরনের অপারেশন আরও আগে দরকার ছিল৷ বরং, সহ্য করতে করতে ভারত অনেক দেরিই করে ফেলেছে৷ লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক , কোলকাতা২৪
পড়া হয়েছে 493 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, 29 সেপ্টেম্বর 2016 22:16