08232019শুক্র
বৃহস্পতিবার, 19 নভেম্বর 2015 07:54

মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার বিজয়

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগীদের মধ্যে সবচেয়ে ঠাণ্ডা মাথার খুনি আলবদর বাহিনীর তৎকালীন প্রধান ও বর্তমান জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং একাত্তরে চট্টগ্রামের ত্রাস যুদ্ধাপরাধী ও বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ পুনর্বিবেচনার আবেদন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে খারিজ হয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার বিজয়। এই দুই রায়ের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বজনহারা মানুষের মধ্যে সাড়ে চার দশকের গুমরে মরা ক্ষোভ ও বেদনার খানিকটা অবসান হবে নিশ্চয়ই। আমরা মনে করি, এই রায় প্রকৃতপক্ষে কেবল মুক্তিযুদ্ধ ও মানবতার বিজয় নয়; আইনের শাসন, সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতন্ত্রেরও বিজয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্ন ও চলমান মামলাগুলোর মধ্যে এই দুটি ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আলবদর বাহিনী মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী মানুষকে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণের ঘৃণ্য অপরাধ ছাড়াও বাঙালির শ্রেষ্ঠ সন্তান শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, সংস্কৃতিকর্মীদের হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করার নীলনকশা এঁটেছিল। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শাখা দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই আলবদর বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছিল এবং এর সহসভাপতি হিসেবে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ছিলেন সেই বাহিনীর প্রধান। তার দণ্ডাদেশ বহাল থাকার মধ্য দিয়ে আমাদের আলোকিত পূর্বপুরুষদের রক্তের ঋণ খানিকটা শোধ হলো। অপর দণ্ডিত কুখ্যাত 'সাকা চৌধুরী' কেবল মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেই স্বাধীনতাকামী জনগোষ্ঠীর ওপর হত্যা, নির্যাতন, জোরপূর্বক ধর্মান্তর, নারী নিগ্রহ চালাননি; স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর রাজনীতিতে তার পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম বিশেষত রাউজান এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ত্রাসের রাজত্ব। তিনি বাংলাদেশের আইন, বিচার ব্যবস্থা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য এবং জাতীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে যেভাবে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিতেন, তাও ছিল শাস্তিযোগ্য। তারপরও আমরা দেখেছি, ২০১০ সালে এই দু'জন আটক হওয়ার পর প্রায় তিন বছর সময় ধরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এই বিচারকাজ চলেছে। এরপর তারা দেশের উচ্চতম আদালতে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পেয়েছেন। সুযোগ পেয়েছেন আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদনেরও। চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী হয়েও তারা যেভাবে বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন ও বিচার প্রক্রিয়ার এসব সুযোগ গ্রহণ করতে পেরেছেন, তা গোটা বিশ্বের যুদ্ধাপরাধ বিচারের ইতিহাসে বিরল। রায় উপলক্ষে আমরা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবার এবং চট্টগ্রাম ও ফরিদপুরে মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর বর্বরতার শিকার সবার প্রতি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করতে চাই। আমরা দেখেছি, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগীরা স্বাধীন বাংলাদেশে দশকের পর দশক ধরে বুক ফুলিয়ে চলেনি কেবল; রাষ্ট্রীয় পদে অধিষ্ঠিত হয়ে লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত হওয়া পতাকার অবমাননাও করেছেন। কিন্তু একাত্তরের অবিনাশী চেতনায় সঞ্জীবিত বাংলাদেশের জনগণ বরাবর সোচ্চার থেকেছে_ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতেই হবে। আমরা আজ স্মরণ করি শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে। তার নেতৃত্বে গঠিত গণআদালত স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচার আন্দোলনে অনন্য মাত্রা যুক্ত করেছে। আর ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি একাত্তরের চেতনায় উজ্জীবিত নবপ্রজন্ম সৃষ্টি করে অভূতপূর্ব 'গণজাগরণ'। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক নানা চাপ সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী এ প্রশ্নে যেভাবে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন ও আছেন, তাও প্রশংসনীয়। এটা ঠিক, সাকা-মুজাহিদের দণ্ড কার্যকরসহ একাত্তরে সব মানবতাবিরোধী অপরাধীর বিচার কাজ সম্পন্ন হতে আমাদের আরও পথ পাড়ি দিতে হবে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গণতান্ত্রিক, ন্যায়বিচারভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ গঠনে এর বিকল্প নেই।
পড়া হয়েছে 551 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, 19 নভেম্বর 2015 08:19