09212020সোম
বুধবার, 25 জুন 2014 09:39

গ্রামীণ দারিদ্র বিমোচনে ইতিবাচক চিত্র প্রতিফলিত

ড. আনু মাহমুদ

এত কিছুর পর ‘বাংলাদেশ যেন মাথা নোয়াবার নয়।’ বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে পাওয়া গেছে ইতিবাচক খবর। রাজধানীতে বিশ্বব্যাংকের এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ বিষয়ে ইতিবাচক খবর পরিবেশন করা হয়। বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘গত এক দশকে (২০০১-২০১০) বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছে প্রায় দেড় কোটি। অথচ

 

এর ঠিক আগের দশকে অর্থাৎ ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমেছিল মাত্র ২৩ লাখ। বিষয়টি কারও কারও কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকতে পারে। স্বভাবতই অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে, বিরোধী দলের অসহযোগিতার কারণে উন্নয়ন প্রকল্প বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে দরিদ্রের সংখ্যা এত বেশি হ্রাসের সুযোগ কোথায়? কিন্তু সেই অসম্ভবই সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এখানে মানুষের আয় এখন আগের তুলনায় বেশি। গত এক দশকে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির বিষয়টি অনেকের কাছে সুস্পষ্ট। আগে একজন মজুর সারাদিন খেটে ১৫০/২০০ টাকা আয় করত; এখন তা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৪০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর ফলে শুধু সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি; আয়ের বৈষম্যও হ্রাস পেয়েছে। এর ফলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল এখন বিত্তবানরা যেমন পাচ্ছে; সাধারণ মানুষও তা থেকে উপকৃত হচ্ছে। প্রবাসী বাঙালীদের পাঠানো অর্থ এখন দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে। এ সঙ্গে দেশের বিপুল পরিমাণ রফতানি আয় এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শহরে একজন রিকশাওয়ালা প্রতিদিন ৫০০ টাকা বা তার বেশি আয় করছে।

 

বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন সূচকে অগ্রগতিও দারিদ্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ। বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে (এইইডআই) বাংলাদেশ একধাপ এগিয়েছে। ২০১২ সালে বিশ্বের ১৮৭টি দেশের মধ্যে মানব উন্নয়নে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৬তম। আগের বছর আমাদের অবস্থান ছিল ১৪৭তম। মানব উন্নয়ন সূচকে এখনও নিম্ন পর্যায়ভুক্ত হলেও দেশটির অগ্রগতি নিম্ন পর্যায়ের গড় প্রবণতার চেয়ে বেশি। পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে যখন অর্থনৈতিক মন্দা অব্যাহত রয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ গত চার বছর ধরে ৬ শতাংশেরও বেশি অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে। এখানে মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হারও অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় কম। এসব কারণেই বাংলাদেশে দরিদ্রের সংখ্যাহ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশের লক্ষ্য, ২০২১ সাল নাগাদ মাঝারি আয়ের দেশে পরিণত হওয়া। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে দরিদ্রের সংখ্যা আরও হ্রাস করতে হবে। সেই সঙ্গে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেক কমিয়ে আনা দরকার। বাংলাদেশে উন্নয়ন কর্মসূচরি বড় শত্র“ জনসংখ্যা বৃদ্ধি। জনসংখ্যা হ্রাসের মাধ্যমে এখনও কার্যকর উন্নয়ন সম্ভব। সেই সঙ্গে দারিদ্র্র হ্রাস আরও বেগবান হতে পারে। এ জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরী।

 

বাংলাদেশকে এশিয়ার মিরাকল বলা হয়েছে অনেক আগেই। বিশ্ব অর্থনীতির ‘নেক্সট ইলেভেন’-এর মধ্যে বাংলাদেশ যে একটি, সে আলোচনা বহুবার হয়েছে। বিশ্বমন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ ছয় শতাংশে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখায় অর্থনীতিবিদরা বিস্মিত। বাংলাদেশকে নিয়ে এসব প্রশংসনীয় তথ্যের মধ্যে যুক্ত হয়েছে আরও একটি ইতিবাচক তথ্য, আর তা হচ্ছে বাংলাদেশে দরিদ্র্যে সংখ্যা দ্রুত কমছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কার্যালয়-ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ১৯৯০ থেকে ২০০০ সালের দশকে বাংলাদেশের দরিদ্রের সংখ্যা কমেছে যেখানে ২৩ লাখ, ২০০০ থেকে ২০১০ সালের এই দশকে তা কমেছে দেড় কোটি। দারিদ্র্য হ্রাসের দুটি কারণ এই সংস্থাটি চিহ্নিত করেছে। এর একটি-মানুষের শ্রম থেকে আয় বাড়ছে, আরেকটি হচ্ছে-পরিবারপ্রতি কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তবে সব কিছু ছাপিয়ে গেছে মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি। কিছুদিন আগেও অর্থনেতিক উন্নতির মাপকাঠিতে মানব উন্নয়ন ধারণাটি উহ্য থাকত। পাকিস্তানের অর্থনীতিবিদ মাহবুবুর হক মানব উন্নয়ন সূচকে উন্নয়নের হিসাব মাধ্যমে নিয়ে এলে এবং অমর্ত্য সেন তাকে পরিশীলিত করলে মানব উন্নয়ন সূচক অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। সেজন্য বাংলাদেশের উন্নয়ন ধারার এই প্রশংসিত গতির পেছনে মানব উন্নয়ন সূচককেই আসল চালিকাশক্তি হিসেবে মনে করা হয়। বাংলাদেশের জন্য আরও আশা জাগানিয়া কথা হচ্ছে, ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে যে ১৮টি দেশ প্রত্যাশার তুলনায় ভালো করেছে বাংলাদেশ এদের মধ্যে অন্যতম।

 

 

এতসব সুখবরের পরও বাংলাদেশের জন্য কিছু খারাপ খবর রয়েছে। সম্প্রতি যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, এর জন্য দেশের অর্থনীতির বারটা বাজছে। তা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নেই। হাজার হাজার কর্মঘণ্টা লোকসানসহ রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি ধ্বংস, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হওয়াতে যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে তা পুষিয়ে নিতে কত বছর লাগবে তা বলা মুশকিল। এর ফলে আমরা আমাদের ছয় শতাংশ জিডিপি ধরে রাখতে পারব না এবং তা কমে পাঁচ দশমিক আট শতাংশে নেমে আসবে বলে স্বয়ং বিশ্বব্যাংকই আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। অথচ ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশে উপনীত হতে গেলে আমাদের প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন সাত থেকে আট শতাংশ। এর জন্য যে বিনিয়োগ আর কর্মসংস্থান দরকার তা ক্রমেই আমাদের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। 

হরতাল ছাড়াও আমাদের দেশে ব্যবসার খরচ ভারত, চীনসহ অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি। এর পেছনে দুর্নীতি অনেকটা দায়ী। তাই দেশের উন্নয়নের জন্য সুশাসন অত্যন্ত জরুরি। যদিও সরকার প্রতিটি পরিবারের জন্য একটি কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করেছে, কিন্তু দেশে বিনিয়োগ না হলে কর্মসংস্থান কীভাবে হবে? আমাদের বিনিয়োগ হার এখন ২৫ শতাংশ। জিডিপি আট শতাংশে নিতে হলে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি দরকার ৩৫ শতাংশের ঊর্ধ্বে। বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারত্বের হার পাঁচ শতাংশ। প্রতিবছর ১৩ লাখ কর্মসংস্থান প্রত্যাশী মানুষ এর সাথে যোগ হচ্ছে। বিদেশি বিনিয়োগ আসছে না। অথচ বিদেশি বিনিয়োগ নিয়েই ভারত আর চীন অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিদেশি বিনিয়োগে আমাদের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। পাকিস্তান ঝুঁকিপূর্ণ আর ভারত বেশি নিয়েন্ত্রিত। এ কারণ অনেক বিনিয়োগকারীর কাছে বাংলাদেশ ছিল পছন্দের জায়গা। বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতি চালিয়ে যেতে হলে সরকারকে যেমন অবকাঠামোর উন্নয়নসহ আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে। যে কারণে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়, তাদেরও এমন কর্মসূচি পরিহার করতে হবে।

 

বহির্বিশ্বে যে দেশটির নাম উচ্চারিত হলে একটি দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠীর কল্পিত চিত্র ভেসে ওঠে, সেই বাংলাদেশে অতীতের তুলনায় দারিদ্র্য কমেছে, অব্যাহত রয়েছে দারিদ্র্য বিমোচনের ধারা-এমন ইতিবাচক খবর পাওয়া গেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দারিদ্র্য বিমোচনসংক্রান্ত ধারণা সূচকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি শিক্ষামূলক গবেষনা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণাটি শিক্ষামূলক হলেও এ জাতীয় গবেষনার তথ্য ব্যবহার করে ইউএনডিপি। ফলে বিষয়টিকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। গবেষনায় দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনের বার্ষিক হার ৩.২ শতাংশ। এই হার প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের চেয়ে অনেক বেশি। বাংলাদেশ একটি সীমিত আয়ের দেশ হলেও দেশটি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সবাই দেশের উন্নয়নে বদ্ধপরিকর। একটি মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার আছে। এ কথা মানতে হবে, আমাদের দেশে এখনো অনেক লোক বাস করে দারিদ্র্যসীমার নিচে। দেশের অনেক নাগরিকের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তার পরও অর্থনীতির কিছু সূচক বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত দেশ আজ অর্থনীতির নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে, এমন সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে।

বহির্বিশ্বে নতুন পরিচিতিই বলে দেয়, বাংলাদেশে দিনবদলের পালা শুরু হয়েছে। এই পালায় যুক্ত হয়েছে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি। সামাজিক নিরাপত্তা বলয় প্রসারিত হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অধিক অংশগ্রহণ দেশটিকে একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থানে নিয়ে গেছে। বাংলাদেশে পণ্য এখন বিদেশের বাজারে সমাদৃত। অন্যদিকে দেশের দক্ষ ও অদক্ষ জনশক্তি দেশের অর্থনীতির জন্য ভূমিকা রাখছে। জনশক্তি রপ্তানি বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি প্রধান মাধ্যম। অন্যদিকে দেশের বিকাশমান পোশাকশিল্প যেমন বৈদেশিক মুদ্রার আয়ের পথ খুলে দিয়েছে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। বিশেষ করে নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে দেশের পোশাক শিল্প।

এতদিনের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বাংলাদেশকে নিয়ে এখন উন্নত বিশ্বে বিশেষ আগ্রহ লক্ষণীয়। এই অর্জন এক দিনে সম্ভব হয়নি। এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হবে। দারিদ্র্য বিমোচনে আজকের সাফল্য আগামী দিনে দেশের সমৃদ্ধি বাড়াবে বলে আমরা আশা রাখি।

 

দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে উপমহাদেশে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ অনেকটা এগিয়ে আছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণা রিপোর্টে জানা গেছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপি’র মানব উন্নয়ন রিপোর্ট ব্যবহার করে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি পরিচালিত এক সমীক্ষায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়। রিপোর্ট অনুসারে ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে ভারতে দারিদ্র্য কমেছে  দশমিক ২ ভাগ, সেখানে ২০০৪ সাল থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দরিদ্র হ্রাসের হার ৩ দশমিক ২ ভাগ। অন্যদিকে ২০০৬ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে নেপালে দারিদ্র্র হ্রাসের হার দাঁড়িয়েছিল ৪ দশমিক ১ ভাগ হারে। আবার ইউএনডিপি’র মানব উন্নয়ন সূচকে ১৮৬টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৬তম, সেখানে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে (১৩৬) থাকলেও পাকিস্তান ১৪৭ এবং নেপাল ১৫৭ তম স্থান পেয়েছে। সামগ্রিকভাবে ভারতে দারিদ্র্য হ্রাসের হার বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় তিনভাগের একভাগ হলেও কেরালা ও অন্ধ্র প্রদেশের মতো রাজ্যগুলো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের হারও বাংলাদেশ ও নেপালের চেয়ে অর্ধেকের কম বলে জানা যায়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিনিয়োগের উপর ভিত্তি কর অপুষ্টি, শিক্ষা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মত বিষয়গুলো সূচক হিসেবে ধরে এই রিপোর্ট তৈরি হয়েছে।

অক্সফোর্ডের গবেষণা রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে দারিদ্র্য দ্রুত কমতে শুরু করেছে এবং বাংলাদেশ, নেপাল ও রুয়ান্ডার মত দেশগুলোকে ‘তারকা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এসব দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের হার অব্যাহত থাকলেও আগামী ২০ বছরে এখানকার চরম দারিদ্রতা সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হবে বলে মত দেয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্তত ৪০টি দেশের নতুন প্রজন্ম তাদের জীবদ্দশায় নিজ দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে দেখতে পাবে বলে সমীক্ষায় আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে এমন নাটকীয় পরিবর্তন ইতিপূর্বে আর কখনো দেখা যায়নি বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়। দারিদ্র্য বিমোচন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে এদেশের সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, নিরলস কর্মস্পৃহা এবং সামাজিক উদ্যোগের পাশাপাশি শিল্পোন্নয়নে বেসরকারি পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীদের বিশাল অবদান রয়েছে। সেই সাথে গ্রামীণ জনপদে প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি ও দাতাদের বিনিয়োগ কার্যকর সুফল বয়ে এনেছে বলা যায়।

 

 

বিগত দশকের মাঝামাঝি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সময়ে গৃহীত তথ্য-উপাত্তের আলোকে বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে ইতিবাচক চিত্র আমাদের আনন্দিত ও আশান্বিত করে। তবে দেশে চলমান রাজনৈতিক সংঘাত ও সহিংসতা দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উন্নয়নের চাকাকে নিশ্চিতভাবেই শ্লথ করে দিচ্ছে। এমনিতেও পশ্চিম বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দা এবং বিগত ২০০৭ সালের এক এগারো পর দু’বছরের সেনাসমর্থিত সরকার এবং বর্তমান মহাজোট সরকারের চার বছরের দেশের বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এরপরও বৈদেশিক কর্মসংস্থান থেকে প্রাপ্ত রেমিটেন্স এবং তৈরি পোশাক শিল্পের রফতানি প্রবৃদ্ধি আমাদের অর্থনীতির চাকাকে যথেষ্ট গতিশীল রাখতে সক্ষম হচ্ছে। বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় ভূমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও স্বল্পতা বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। সীমাবদ্ধতা ও স্বল্পতা বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা ও অপরিণামদর্শিতা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সাফল্যের হাত ধরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতসহ গ্রামীণ নারী ও স্বল্পশিক্ষিত দরিদ্র যুবকদের বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিকারী সেক্টরগুলোর বিনিয়োগ এখন নানাভাবে হুমকির সম্মুখীন। মূলত এসব সেক্টরের উপর নির্ভর করেই বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য  ও গ্রামীণ সেনিটেশনসহ যে সকল সূচকে বাংলাদেশ তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও পারিবারিক উদ্যোগের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, সামাজিক বিনিয়োগ এবং দেশি-বিদেশি বেসরকারি সংস্থার অবদান অস্বীকার করা যায় না। শুধু বিদেশি গবেষণা বা সমীক্ষা নয়, আমাদের দারিদ্র্য বিমোচন এমডিজি অর্জনে নিজস্ব গবেষণা ও মূল্যায়ন থাকা আবশ্যক এবং চলমান বাস্তবতার আলোকে দারিদ্র্য বিমোচন, মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 

বাংলাদেশ নিকট অতীতের প্রেক্ষাপটে মানব উন্নয়নে অনেক দূর এগিয়ে গেছে এটা এখন বিশ্বস্বীকৃত। পাশ্চাত্য দেশগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলছে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুতই একটি অগ্রসরমান দেশ এই তো ১৫ মার্চ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০১৩ সালের যে মানব উন্নয়ন সূচক প্রকাশ করেছে, তাতেও দেখা গেছে বাংলাদেশ ১৮৭টি দেশের মধ্যে ১৪৬তমে উঠে এসেছে। যা গত বছর ছিল ১৪৭তমে। প্রতিনিয়ত যে বাংলাদেশকে ‘ব্যতিক্রমধর্মী’ সঙ্কট মোকাবেলা করতে হয় সে তুলনায় গত তিন দশকে বাংলাদেশের উন্নতি অসামান্য বলতে হবে। মানব উন্নয়ন সূচকে এগিয়ে যাওয়া মানেই সুস্পষ্টভাবে দারিদ্র্যের প্রভাব কমে আসা। 

 

 

কয়েক দশক আগেও যে দেশটি ছিল পৃথিবীর দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী অন্যতম একটি রাষ্ট্র, সেটিই স্বপ্ন দেখছে আগামী এক দশকে মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে ওঠার। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় মতবিনিময় সভায় প্রায়ই বলে আসছেন বাংলাদেশ শিগগিরই এ অঞ্চলের ‘টাইগার’ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের সুদূর অতীত ইতিহাস যে ছিল ‘সোনার বাংলা’, সেটা আমরাও যেমন দেখিনি, তেমনি মার্কিন রাষ্ট্রদূতও দেখেননি। কিন্ত আমরা যারা ইতিহাসমাত্রই কমবেশি অবগত আছি সবাই জানি এ দেশ এক সময় আক্ষরিক অর্থেই ‘সোনার বাংলা’ ছিল। সেই লব্ধ ইতিহাসজ্ঞানের আলোকেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বলছেন, অচিরেই এ দেশ ‘সোনার বাংলা’ হয়ে উঠবে। তিনি যতটা বাস্তবতা ঘনিষ্ঠ দর্শননির্ভর ভবিষ্যদ্বাণী করছেন ততোটা হয়তো তাত্ত্বিক বিবেচনায় ধরা দেবে না। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যখন সে তাত্ত্বিক সমীকরণে যায় তখন অনেক বুঝেশুনেই যায়।

 

 

সম্প্রতি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকায় প্রকাশিত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দারিদ্র্য ও মানব উন্নয়ন পদক্ষেপ’ শীর্ষক এক সমীক্ষায় যে তথ্যাবলি উঠে আসে তাতে দেখা যায়, বাংলাদেশে দ্রুতই দারিদ্র্র কমে আসছে। এতটাই কমছে যে, দারিদ্র্য কমার হার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতকেও টপকে যাচ্ছে। ভারত নিকট অতীতেও চরম দারিদ্র্য কষাঘাত জর্জরিত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে সভ্য দুনিয়ার কাছে পরিচিত ছিল। দেশটি আসলে পিছিয়ে ছিল বারবার চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে। যেখানেব একদিকে জায়ান্ট ধনকুবেরদের আলীশান জীবনযাপন, আরেকদিকে দারিদ্র্যসীমার এমন নগ্নরূপে অবস্থানকারী জনগোষ্ঠী, যার অর্থনৈতিক বৈপরীত্য অতি পয়লা দৃষ্টিতেই সাধারণ্যে স্পষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের সৌভাগ্য, এখানে সেরকমভাবে এতটা নগ্নরূপ অর্থনৈতিক বৈপরীত্র দেখা দেয়নি। তবে ইদানিং সে ধারা অনেকটা হেরফের হয়ে উঠছে তা বিভিন্ন সমীক্ষায় উঠে আসছে। প্রকাশিত হচ্ছে এখানেও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অনেকটা ছোঁয়া লেগেছে। বাংলাদেশে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দারিদ্র্য অনেক কমে আসছে, এটা নিশ্চয় আমাদের জন্য সুখের। কিন্তু এ দিকটিতেও সবাইকে সজাগ থাকতে হবে ভারতের মতো সে রকম অর্থনৈতিক বৈষম্যের ব্যবধান এখানেও যেন নগ্নরূপ হয়ে না ওঠে।

 

 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে-যে দেশগুলো দারিদ্র্য দূরীকরণে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে সেগুলো হলো-বাংলাদেশ, রুয়ান্ডা ও নেপাল। এছাড়া ঘানা, তানজানিয়া, কম্বোডিয়া এবং বলিভিয়া। প্রধান দায়িত্বশীল ভূমিকা ও কৃতিত্ব বিশেষভাবে ওঠে এসেছে যাদের সেটা বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর কর্মসূচি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, অবকাঠামো এবং সুপেয় পানি সরবরাহে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এ দারিদ্র্য দূরীকণের সূচকে বিশেষ লক্ষ্য থাকে। আয়ের দিক থেকে খুব এগিয়ে না থাকলেও এ সূচকগুলোয় সীমাবদ্ধ আয়ের মধ্যদিয়েই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের মানুষ আয় বুঝে পরিমিত ব্যয়ের মধ্যদিয়েও যে মানব উন্নয়ন সূচক বাড়াতে সক্ষম সেখানেও সে বিশ্বে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখেছে। আমরা মনে করি মানব উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখতে হবে, সেইসঙ্গে কোনোভাবে বৈষম্যের ব্যবধানটিও যাতে এখানে নেতিবাচকরূপে বাসা না বাঁধে সে দিকটিতেও সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

 

- লেখক-প্রাবন্ধিক, অর্থনীতির বিশ্লেষক, কলামিষ্ট। ঊ-সধরষ : ধহঁসধযসঁফ@ুধযড়ড়.পড়স

 

 

 

পড়া হয়েছে 1533 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বুধবার, 25 জুন 2014 09:55