10152019মঙ্গল
মঙ্গলবার, 16 জানুয়ারী 2018 11:33

নতুন পৃথিবী গড়বেন শিল্পী-সাহিত্যিকরা: প্রণব মুখার্জি

অনুষ্ঠানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি অনুষ্ঠানে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি
নিউজ ফ্ল্যাশ প্রতিবেদক মাত্র ১৯ মিনিটের বক্তব্য। আর তাতেই জয় করে নিলেন প্রাঙ্গণজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজারো মানুষের মন। তিনি ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী আয়োজনে যোগ দিয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় দূষণ মানুষের চিন্তা-ভাবনা, মনে ও কাজে। আর এ দূষণ দূর করে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে পারবেন শুধুমাত্র শিল্পী-সাহিত্যিকরা। সোমবার বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। 'বিশ্ব মানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ'- এ প্রতিপাদ্যে দুই বাংলার সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে এ সম্মেলনের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদ। সহযোগিতায় ছিল বাংলা একাডেমি, নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম ও ভারতের চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। সমাপনী বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদের আহ্বায়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। প্রণব মুখার্জি বলেছেন, কোনো কারণ ছাড়া একেকটা বড় বড় যুদ্ধে কত মানুষ মারা যাচ্ছে! গত এক দশকে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের কথা ভাবুন- হিংস্রতার শিকার হচ্ছে কত নিরীহ মানুষ! এই হিংস্র পৃথিবীতে মানুষ কী করে বাস করবে? এই হিংস্রতা প্রতিহত করতে জাতিসংঘ বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোনো সম্মেলন থেকে সমাধান আসবে না। এই দূষণ থেকে মুক্ত করতে পারবেন স্রষ্টা। যারা কবি-সাহিত্যিক, তারাই নতুন পৃথিবী সৃষ্টি করবেন। তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে মানব সভ্যতার ইতিহাস এ কথা বলে গেছে- হিটলার, মুসোলিনিরা নয়; সভ্যতার ইতিহাস নির্মাণ করে গেছেন প্রফেট, ক্রাইস্ট, বুদ্ধ। দিজ্ঞ্বিজয়ী বীরেরা নয়; সভ্যতার ইতিহাসের দিক নির্মাণ করেছেন লেখক-কবি-সাহিত্যিক তথা শিল্পীরা। পরীক্ষায় পাসের জন্য দিজ্ঞ্বিজয়ী বীরদের নিয়ে পড়াশোনা করা যায়; পাসের পর তা বেমালুম ভুলে যাই। কিন্তু শিল্পীর ছবি, কবির কবিতা বা প্রিয় উপন্যাস কখনও ভোলা যায় নাকি? যে গান, সানাই বা সরোদের সুর আমাদের প্রিয়; তা কখনও ভুলতে পারি আমরা? ২০১২ সালে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের শুরুতেই বিদেশ সফর হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। দায়িত্ব শেষের প্রথম সফরটিও তার স্ত্রীর জন্মভূমিতে। নিজের বক্তব্যের শুরুতেই রসিকতার ঢঙে এ সম্মেলনে তার আগমনের ব্যাখ্যা দিয়ে প্রণব মুখার্জি বলেন, আমি তো পাঠক, একজন দর্শক। আমি স্রষ্টা নই; সৃষ্টিকর্ম তো আমার নেই। এই আন্তর্জাতিক সাহিত্যের মহামেলায় আমার কাজটা কী হবে? বীরভূমের গ্রামের ভাষায় রাজমিস্ত্রিদের; সিমেন্ট, বালু, মসলা ইত্যাদি এনে দেওয়া লোকদের যোগাই বলা হয়। এই সম্মেলনে আমার কাজটা এখানে অনেকটা যোগাইয়ের মতো। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বই পড়তে না পারায় দুঃখ করে তিনি বলেন, ১৯৬৯ থেকে ২০১২ সাল- দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে আমি খুব বেশি পড়ার সুযোগ পাইনি। ২৫ বছর মন্ত্রী ছিলাম। সরকারি কাজ, সংসদীয় কাজের ঠেলায় পড়ার সময় পাইনি। ৩৩০ কক্ষের রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রথমে এসে ভাবলাম- এখানে আমার কাজ কী? প্রধানমন্ত্রী ফাইল পাঠাবেন, আইন প্রণয়ন করবেন সাংসদরা; আমি তাদের পরামর্শ দেব। ভারতের সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির এখানে ভূমিকা কম। বছরে একদিন সাংসদদের ডেকে বক্তৃতা দেব। সেখানে দাঁড়ি, কমা, ফুল স্টপ- সবটাই মন্ত্রিসভার তৈরি। রাষ্ট্রপতিকে বলতে হবে- মাই গভর্নমেন্ট। রাষ্ট্রপতি ভবনে তার পাঠ্যাভাস্যের বিষয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে দেখলাম প্রাসাদসম বিশাল ভবন। পরিসংখ্যানবিদদের মতে, ৩৩০ টি কক্ষ বিশিষ্ট এমন ভবন বিশ্বে আর কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের নেই। রাষ্ট্রপতি হলে কাজ করার সুযোগ নেই। কাজ তো করেন প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও সাংসদরা। রাষ্ট্রপতির কাছে প্রধানমন্ত্রী মাঝে মাঝে পরামর্শ চাইবেন। বছরে একবার সাংসদদের ডেকে বক্তৃতা করব। এছাড়া, ভারতে সরকার তৈরি হয় মানুষের ভোটে। দল প্রধানমন্ত্রী ঠিক করেন। রাষ্ট্রপতির কাজ 'নৈবেদ্যর মণ্ডা'র মত বসে থাকা। তবে একটা কাজ আছে রাষ্ট্রপতির। প্রচুর বই রাষ্ট্রপতি ভবনে। প্রচুর কাগজ, দলিল দস্তাবেজ সেখানে। ইতিহাসের প্রচুর উপাদান। যেসব পড়তে তিনটি প্রেসিডেন্সিয়াল টার্ম লাগবে। তো, অতদিন তো সময় পাওয়া যাবে না। তার আগেই ঈশ্বর আমাকে ডেকে নেবে। বলবেন, এসো আমার কাছে। তাই আমি দেরি না করে পড়তে শুরু করলাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে বাংলা ভাষা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৯১৩ সালে নোবেল প্রাপ্তিতে বাংলাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরে ভাষা আন্দোলনে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষায় ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। তাদের কাছে আমরা ঋণী। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাসকে তারা রক্ষা করেছেন। যারা আগ্রাসন করে তাদের হাতে সেই ইতিহাসকে লুট হয়ে যেতে দেননি। সেই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ভাষা সাহিত্য সম্মেলন হবে না তো কোথায় হবে! বাংলা সাহিত্য শুধুমাত্র তার কল্পনা, চিন্তা-প্রতিভার প্রতিফলন নয়, তার মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানবতার প্রতিফলন ঘটে। তাই তো এই মঞ্চ থেকে ঘোষণা আসে পৃথিবীকে এই সাম্প্রদায়িকতার বিষবাস্প থেকে বাাঁচানোর। লেখক-সাহিত্যিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আসুন এই সংকল্প করি, ভবিষ্যত প্রজন্মকে আমরা হিংস্রতার সব বিষবাস্প থেকে বাঁচাবো। এই হোক আজকের অঙ্গীকার। অনুষ্ঠানে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক। কিন্তু তাদের মনে সাম্প্রদায়িকতার কোনো স্থান নেই। আমাদের সমাজে ব্যাপক সমতা রয়েছে। ধনী-দরিদ্র বৈষম্য হচ্ছে, কিন্তু তারপরেও সমাজের যে কোনো স্তর থেকে যে কোনো ব্যক্তি তার মেধার দ্বারা যে কোনো উচ্চতায় নিজের স্থান করে নিতে পারে। এটা আমাদের বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার খুব উল্কেখযোগ্য দিক। আসাদুজ্জামান নূর বলেন, এ ধরনের উৎসব যত বেশি হবে আমার তত বেশি সংগঠিত হবো। আমাদের পথচলাতে সাহস ও শক্তির উৎস হবে এ ধরনের সাহিত্য সম্মেলন। শাহরিয়ার আলম বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সম্পর্ক বহুমুখী ও বহুমাত্রিক। বর্তমানে সেই সম্পর্ক অনন্য উচ্চতায় আসীন। অধ্যাপক আনিসজুজামান বলেন, এ সম্মেলনে আলোচনায় আমরা বহু কিছু শিখেছি। তারচেয়েও বড় কথা আমরা পরস্পরকে নিবিড়ভাবে জেনেছি। মানুষের সবচেয়ে বড় ভয় অজানাকে। জানাশোনা হলে অজানার শংকাও কেটে যায়। ভয় কেটে গিয়ে সম্পর্ক দৃঢ় হয়। এ সম্মেলন সামনের দিনগুলিতে শুধু বাঙালিত্বের গৌরবকেই স্মরণ করবে না বরং সামনে এগিয়ে যাবার নির্দেশনা খুঁজে নেবে। শামসুজ্জামান খান বলেন, সাংস্কৃতিক আদান প্রদান জরুরি। সেজন্য দুই দেশের সংস্কৃতি দু'দেশের মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে। উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভারতের টিভি চ্যানেলগুলো বাংলাদেশে দেখা যায় কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে দেখা যায় না-এমন একপাক্ষিক অবস্থা হলে এই সাহিত্য সম্মেলনগুলোর ভঙ্গুর অবস্থা কাটবে না। যোগেন চৌধুরী বলেন, বাংলা ভাষাকে উজ্জীবিত করবে প্রাণ জোগাবে এ ধরনের সম্মেলন। এই সম্মেলন সারা বিশ্বের মানুষকে কাছে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক দৃঢ় হচ্ছে এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে। আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন ইউসুফ 'ঢাকা ঘোষণা' দেন, এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় তিন দিনের এই সম্মেলন। তিনি বলেন, আমরা সকল প্রকার বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব সংঘাতের বিরোধী এবং তাই বিশ্ব শান্তির পক্ষে নিজেদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করছি। আমরা সকল মানুষের মৌলিক অধিকারে বিশ্বাসী এবং প্রত্যেক মানবগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা তাদের অলঙ্ঘনীয় অধিকার বলে ঘোষণা করছি।' কবিতাপাঠ করেন কবি কামাল চৌধুরী। এ সময় মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের সহ-সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য। সবশেষে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তিনি গেয়ে শোনান 'ওগো দুখজাগানিয়া তোমায় গান শোনাব' ও 'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি'।
পড়া হয়েছে 350 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, 18 জানুয়ারী 2018 10:41