01232022রবি
বুধবার, 03 নভেম্বর 2021 10:34

নগদের জন্য কোম্পানী গঠনে হিমসিম খাচ্ছে মন্ত্রণালয়

সিদ্দিকুর রহমান: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মেনেই বেসরকারী মোবাইল ফিনানসিয়াল সার্ভিস নগদ এর লাইসেন্স পেতে কোম্পানী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এরমধ্য দিয়ে এই প্রথম সরকার পাবলিক ও প্রাইভেট যৌথ অংশীদারিত্বে একটি লাভজনক সেবায় যুক্ত হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ ঝুঁকি মাথায় রেখে নতুন অভিজ্ঞতায় কোম্পানী গঠন নিয়ে মন্ত্রণালয় হিমসিম খাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্র জানায়, বেসরকারী মোবাইল ফাইনানসিয়াল সার্ভিস নগদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স পেতে হলে ডাক ও টেলিযোগযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত একটি কোম্পানী হতে হবে। বিকাশ ও রকেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাথে সাব-সিডিয়ারি কোম্পানী করার শর্ত পূরণ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স পেয়েছে। নগদকেও একই শর্ত পূরণ করে লাইসেন্স নিতে হচ্ছে। এজন্য মন্ত্রণালয় কোম্পানী গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। নগদ এর জন্য কোম্পানী গঠন নিয়ে কোন জটিলতা আছে কিনা জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার মঙ্গলবার নিউজফ্ল্যাশ ২৪ বিডি ডটকমকে বলেন, কোম্পানী গঠন নিয়ে কোন সমস্যা বা জটিলতার কথা সরকারি তরফ থেকে বলা হয়নি। আপনারা (মিডিয়া) এসব তথ্য পান কোথায়? আপনাদের মাধ্যমে একটা শ্রেণী নগদ নিয়ে গুজব ছড়ায়। তিনি বলেন, নগদ একটি সেবা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এর উদ্ধোধন করেছেন। পাবলিক ও প্রাইভেট যৌথ উদ্যোগের সেবা কার্যক্রম এটি। নগদ ভালো করছে। মন্ত্রণালয়ের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, পাবলিক ও প্রাইভেট পার্টনারশীপে কোন লাভজনক উদ্দেশ্যে করা কোম্পানী সরকারের কোন মন্ত্রণালয়ে নেই, এটি প্রথম। কোম্পানীর গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে তারা আন্ত:মন্ত্রণালয়ে বৈঠক করেছে। বিশেষ করে আইন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতামত এক্ষেত্রে জরুরি হয়ে পড়েছে। কয়েকটি মন্ত্রণালয় এব্যাপারে মতামত দিলেও গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রণালয়ের মতামত এখনও পাওয়া যায়নি। ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো: আফজাল হোসেন কোম্পানী গঠনের ব্যাপারে মঙ্গলবার তার কার্যালয়ে নিউজফ্ল্যাশ ২৪ বিডি ডটকমকে বলেন, লাভের উদ্দেশ্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপে কোন কোম্পানী সরকারের নেই। নতুন একটা বিষয়ে কোম্পানী গঠনে আন্ত:মন্ত্রণালয়ের মতামত প্রয়োজন। সেলক্ষ্য আন্ত:মন্ত্রণালয়ের সভা হয়েছে। কিছু মতামত সরাসরি পেয়েছি। বাকীদের মতামত শিগগিরই পাবো। কোম্পানী গঠনের কার্যক্রম চলছে। ডাক বিভাগের মহাপরিচালক (এমডি) মো: সিরাজউদ্দিন সোমবার নিউজফ্ল্যাশ ২৪ বিডি ডটকমকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী কোম্পানী গঠনের মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর সাথে যুক্ত থেকে যেভাবে বিকাশ ও রকেট ব্যবসা করছে। একই ভাবে নগদকেও একই ভাবে ডাক বিভাগের সাথে কোম্পানী করে ব্যবসা করতে হবে। এমন নির্দেশনা ব্যাংক দিয়েছে। তিনি বলেন, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের অধীন কোন নেই। সেজন্য কোম্পানী গঠনের লক্ষ্য আন্ত: মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুসারে এর কার্যক্রম চলছে। নগদ থেকে সরে যাওয়ার কোন সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের নেই। তবে কোম্পানী গঠনে সময় লাগতে পারে। যেহেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে নতুন কোম্পানী সেক্ষেত্রে আইন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে এগুতে হচ্ছে। আন্ত:মন্ত্রণালয়ের সভায় অনেক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নগদ এর সাথে সরকারের এই ধরণের সেবাধর্মী ব্যবসায় যুক্ত হওয়া ঠিক হয়নি। কারণ হিসেবে তারা বলেন, কোম্পানীর ৫১ভাগ শেয়ার সরকারের হাতে থাকবে। বাকী বেসরকারি মালিকানায় থাকবে। উভয়পক্ষে কোম্পানীর পরিচালক থাকবেন। সরকারের পরিচালক সংখ্যা বেশি হলেও তারা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় হয়তো যথাযথ ভূমিকার রাখতে পারবেন। যেহেতেু এটা প্রযুক্তি নির্ভর ব্যবসা এর সম্পূর্ণ অপারেটিং সিষ্টেম থাকবে বেসরকারি পরিচালকদের হাতে। সেটি নজরদারি করার মতো এক্সপার্ট গ্রুপ বা ম্যান পাওয়ার সরকারের নেই। লেনদেনের পুরো কার্যক্রম বেসরকারি কোম্পানীর লোকদের হাতে থাকছে। নগদ-এ অর্থ লোপাটের কোন ঘটনা ঘটলে এর পাবলিক মানির পুরো দায় সরকার ও মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে। এই কঠিন বিষয়গুলো মাথায় রেখে কোম্পানী করতে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের সভায় যোগ দেয়া একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজফ্ল্যাশ ২৪ বিডি ডটকমকে বলেন, নগদ এর সাথে সরকারের যুক্ত হওয়া ঠিক হয়নি। ডাক বিভাগের প্রতি মানুষের আস্থার কারণে নগদ এই পর্যন্ত এসেছে। লেনদেনের ক্ষেত্রে বিকাশ ও রকেটের চেয়ে গ্রাহককে বেশি সুবিধা দিচ্ছে নগদ। এ কারণে নগদের প্রতি মানুষের জোকও বেড়েছে। এই পর্যায়ে নগদ থেকে সরে আসার সুযোগও সরকারের নেই। তিনি বলেন, নগদ এর সেবা কার্যক্রমের উদ্ধোধনের সময়ে প্রথম লেনদেনটি করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সেকারণে নগদের জন্য কোম্পানী গঠন করতে হবে। ডাক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ছাতার নিচে থাকায় নগদ একচেটিয়া ব্যবসায়িক সুবিধা পাচ্ছে দিকে। সরকারি লেনদেনও বেশি হচ্ছে। ডাক বিভাগের প্রতি আস্থার কারণে সাধারণ মানুষের ব্যবহার বেড়েছে। বাংলাদেশ পোষ্ট অফিস কে ৫১% শেয়ার দিয়ে সাথে নগদ এর প্রস্তাবিত কোম্পানীটি গঠিত না বলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এর বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী নগদ মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। কারণ মোবাইল ব্যাংকিং করতে হলে নগদের মতো ফিনটেক কোম্পানী ̧লোকে অবশ্যই ব্যাংকের সাবসিডিয়ারী হতে হবে। নগদ কোম্পানীতে বাংলাদেশ পোষ্ট অফিসের কোন শেয়ার না থাকলেও আইনের অব্যবহার করে ২০১৯ সাল থেকে নগদ পোষ্ট অফিসের সার্ভিস হিসেবে পরিচয় দিয়ে ব্যবসা করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে আসছে। পোষ্ট অফিসের একজন কর্মকর্তা বলেন, বিগত বছরগুলোতে নগদ বিপুল পরিমান লাভ করলে সরকারী কোষাগারে খুব কম পরিমান লভ্যাংশ জমা পড়েছে। যদি পোষ্ট অফিসের শেয়ার থাকত তা হলে তার পরিমান সাবসিডিয়ারী কোম্পানীতে প্রয়োজনীয় পুঁজির পরিমানের কাছাকাছি হতো। সুতরাং নগদকে পোষ্ট অফিসের সার্ভিস হিসেবে ব্যবসা করতে হলে, সরকারকে অবশ্যই ৫১% শেয়ার দিতে হবে বিনা পুঁজিতে। সাবসিডিয়ারী কোম্পানী গঠন উপলক্ষে সম্প্রতি বাংলাদেশ পোষ্ট অফিস এর সাথে নগদের একটি সভা হয়। সূত্র জানায় , নগদের প্রতি সরকারের কিছু মনোভাব তুলে ধরা হয়েছে। এ অপারেটরটির বিধি লংঘন করে খাম খেয়ালী পূর্ণ আচরন, লাখ লাখ টাকার সরকারী ভাতা ও উপবৃত্তির টাকা বিতরণে ব্যর্থতা এবং গ্রাহকদের অর্থ নিয়ে বিপুল সংখ্যক প্রতারণার ঘটনা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, নিয়ম বর্হিভূত ভাবে একাউন্ট খোলে নগদ সরকারী অর্থ ও ভাতা বিতরণে মারাত্মক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। প্রায় প্রতিটি জেলায় শত শত গরীর অসহায় মানুষ, মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীর অভিভাবক নগদের মাধ্যম ভাতা ও বৃত্তির টাকা প্রাপ্তিতে হয়রানীর শিকার হচ্ছে যা সরকারের ভাবমূর্তিকে নষ্ট করছে। শুধু এক ময়মনসিংহ জেলাতেই নগদের দুর্বলতায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের এজেন্ট ও কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় গরীব মানুষের ১০ কোটি টাকা প্রতারক চক্র হাতিয়ে নিয়েছে। পুলিশ বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করলেও নগদের অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং কারিগরী ব্যর্থতার জন্য আরো অনাকাংঙ্খিত ঘটনার আশংকা রয়েছে, বলেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়র একজন কর্মকর্তা। সম্প্রতি ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ঘোষনা করেছেন, শীঘ্রই বাংলাদেশ পোষ্ট অফিস ও নগদ মিলে একটি সাবসিডিয়ারী কোম্পানী গঠন করা হবে যা মোবাইল ব্যাংকিং অপারেটরদের জন্য বাধ্যতামুলক। বিকাশ, রকেট ও সিউর ক্যাশসহ দেশের ১৭টি মোবাইল ব্যাংকিং অপারেটর ব্যাংকের সাবসিডিয়ারী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্সে নিয়ে ব ̈বসা করে আসছে। কেবলমাত্র নগদ এর ব্যতিক্রম রেগুলেশনের বাইরে থাকায় ২০১৯ থেকে ২০২০ এর মাঝামাঝি পর্যন্ত নগদ তার গ্রাহককে প্রতিদিন ৫ লাখ টাকা লেনদেন এর সুযোগ দেয় যা অন্য অপরেটরদের বেলায় ছিল মাত্র ৫০ হাজার টাকা। এত বিপুল ব্যবসার পর নগদের যে লাভ হয়েছে, তার মাত্র কিছু অংশ সরকারী কোষাগারে এসেছে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পোষ্ট অফিসের কোন নিয়ন্ত্রন বা তদারকী ছিল না। সমাজ কল্যান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, নগদের মাধ্যমে সরকারী ভাতা বিতরণ না করে দক্ষতার নিরিখে অনুসন্ধান অপারেটরদের কাজে লাগালে সরকারের অর্থের সাশ্রয় হবে এবং নতুন করে পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে না। কারণ সরকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নগদ কখনও লাভজনক হবে না। টেলিটক এর বড় উদাহরন। ২০১৯ সালে যাত্রার পরদিন থেকেই নগদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মের তোয়াক্কা না করে পোষ্ট অফিসের সার্ভিস দাবী করে গ্রাহকদের তার চ্যানেলে বিপুল অংকের টাকা লেনদেন এর সুযোগ করে দেয় যা অর্থপাচারের আশংকা তৈরী করে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে অর্থ মন্ত্রনালয় নগদকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যম নিয়ম মেনে ব্যবসা করার চাপ দেয়।
পড়া হয়েছে 90 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বৃহস্পতিবার, 04 নভেম্বর 2021 17:28

এ বিভাগের সর্বশেষ সংবাদ

ফেসবুক-এ আমরা