10222017রবি
রবিবার, 01 অক্টোবার 2017 10:40

বেসিক ও সোনালী ব্যাংকের ৩৩৩৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ

সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের ১৮ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে তিন হাজার ৩৩৮ কোটি টাকাই দেয়া হয়েছে অস্তিত্বহীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ভুয়া ব্যক্তির নামে। এমনকি এগুলোর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের জামানতও ভুয়া। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনটি সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কছে পেশ করা হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে দেয়া তিন হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে দুই হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা বেসিক ব্যাংকের। আর সোনালী ব্যাংকের রয়েছে এক হাজার চার কোটি টাকা। ব্যাংক দুটির সংশ্লিষ্টদের যোগসাজশেই এই অর্থ পুরোটাই আত্মসাৎ করা হয়েছে। ঋণের টাকা উত্তোলনের পর থেকেই ঋণগ্রহীতাদের সন্ধান পাচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। বেসিক ব্যাংকের এই লুটপাট ও অনিয়ম হয়েছে ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর মেয়াদকালে। যদিও তিনি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। জানতে চাইলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের চলতি দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত সচিব কামরুন নাহার আহমেদ রোববার গণমাধ্যমকে বলেন, এ ধরনের ফাইল এখনও আমার কাছে আসেনি। তবে ঘটনা সঠিক হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলতে পারে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, এটি পরিষ্কার বলা যেতে পারে, এগুলো কোনো ঋণ ছিল না। দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ জন্য ভুয়া জামানত ব্যবহার করা হয়। সাধারণ ঋণ হলে এটি আর্থিক অপরাধ ছিল। কিন্তু এটি হচ্ছে ফৌজদারি অপরাধ। এটি এক ধরনের জালিয়াতি। ঋণ না বলে জালিয়াতি বলাই ভালো। এ টাকা ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে এ টাকা দেয়ার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা উচিত। জানা গেছে, ভুয়া জামানত ও প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ জানতে চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ ব্যাপারে তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. ইউনূসুর রহমানকে ডিও (আধা সরকারি পত্র) লেটার দিয়েছেন। আধা সরকারি পত্রের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৯ থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল), বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ওপর একটি প্রতিবেদন তৈরি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সেখানে দেখা গেছে, বেসিক ও সোনালী ব্যাংকে ৬৪টি ভুয়া জামানত ও প্রতিষ্ঠান শনাক্ত করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় সর্বনিন্ম এক কোটি বা তারও বেশি অর্থ ঋণ নেয়া হয়েছে। আর জনতা, অগ্রণীসহ বাকি ছয়টি ব্যাংকে এ ধরনের কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন এ মজিদ শনিবার বলেন, ভুয়া জামানত দিয়ে ঋণ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঋণ নেয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, প্রতিষ্ঠান নেই, জামানত ভুয়া সেখানে ঋণ দেয়া হয়েছে। এখানে ব্যাংকের যোগসাজশ আছে। এসব ঋণের ব্যক্তিগত গ্যারান্টারদের খোঁজ করা দরকার। এসব টাকা পাওয়া কঠিন হবে। কারণ খুঁজে না পাওয়া গেলে তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় হবে কী করে। এখন আদালতে মামলা করা উচিত। সর্বশেষ হিসাব মতে, বেসিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ সাত হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা। এই খেলাপির প্রায় ৩২ শতাংশ লুটপাট করা হয় ভুয়া জামানত ও অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয় ভুয়া জামানত, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেসিক ব্যাংক থেকে এই অর্থ বের করে নেয়া হয়। এর মধ্যে শুধু ভুয়া জামানত ও জামানতবিহীন ঋণ নেয়া হয় দুই হাজার ২৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকার। ৫৫টি ঘটনার মাধ্যমে এই অর্থ হাতিয়ে নেয়া হয়। এর বাইরে আরও পাঁচটি ঋণ দেয়া হয় কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে। যেখানে ৭০ কোটি আট লাখ টাকার ঋণ নিয়ে লুটপাট করা হয়। পাশাপাশি আরেকটি জালিয়াতির ঘটনায় নিজের নাম পরিচয় ভুল দাখিল করে ১৬ কোটি ২২ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এদিকে সর্বশেষ তথ্যমতে, সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ হচ্ছে ১০ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা। এর প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ লুটপাট হয় ভুয়া জামানত, ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত শীর্ষ সোনালী ব্যাংকে প্রায় ১০০১ কোটি টাকার ঋণ দেয়া হয় ভুয়া প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে। ব্যবসায়িক কার্যক্রমবিহীন নামসর্বস্ব দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০০১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। অপর একটি ঘটনায় ভুয়া জামানত দিয়ে তিন কোটি টাকা লুট করা হয় ব্যাংকের। প্রসঙ্গত, ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখায় প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। বেসিক ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তে আরও এক হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা বেরিয়ে আসে। সব মিলে এখন পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছে। যুগান্তর।
পড়া হয়েছে 11 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: রবিবার, 01 অক্টোবার 2017 10:49