12122019বৃহঃ
শিরোনাম:
মঙ্গলবার, 19 নভেম্বর 2019 08:02

পরিবহন নেতাদের উস্কানীতে বাস ধর্মঘট

বিশেষ প্রতিনিধি সড়ক আইন কার্যকরে বাধার সৃষ্টি করছেন এক শ্রেণীর বাস মালিক। চলেছ অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘট। এছাড়া গুজব ছড়ানো হচ্ছে। তবে পরিবহেনর নেতারা বলছেন, তারা ধর্মঘট ডাকেননি। অথচ খুলনা,রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়কে বাস চলছে না। হুট করে বাস চলাচল বন্ধ হবার কারণে দূরগামী যাত্রীরা চরম দুভোগের মাঝে পড়েছেন। রাজধানীসোমবার সকালে বলাকা পরিবহনের একটি গাড়িকে নতুন আইনে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়লে সায়েদাবাদ থেকে গাজীপুরে চলাচল করা বলাকা পরিবহনের সব গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। অন্যান্য কোম্পানির বাস চলাচলও সীমিত হয়ে যায়। প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর মালিক সমিতির পক্ষ থেকে খোঁজ নেওয়া হলে জানা যায়, ২৫ হাজার টাকা জরিমানার ঘটনা সত্য নয়, আইনের একই ধারায় নূ্যনতম টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ তথ্য মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্নিষ্ট পরিবহনের সবাইকে জানানোর পর দুপুরের পর বাস চলাচল স্বাভাবিক হয়। অন্যদিকে, নতুন পরিবহন আইন বাস্তবায়ন যাতে না হতে পারে, তার জন্য পরিবহন নেতাদের একটি অংশ বিভিন্ন স্থানে গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার ইন্ধন দিচ্ছে বলেও তথ্য পাওয়া গেছে। এভাবেই নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর করাকে কেন্দ্র করে গুজব আর ইন্ধনেই বন্ধ হচ্ছে গাড়ি। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, গতকাল সকাল থেকেই 'এখানে অমুক পরিবহনের গাড়িকে এত টাকা জরিমানা করা হয়েছে, অমুক গাড়ি রেকার দিয়ে টেনে ডাম্পিংয়ে ফেলে হয়েছে'- এমন সব গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলেই মূলত সারাদেশে হঠাৎ বিভিন্ন স্থানে তাৎক্ষণিক ধর্মঘটসহ গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। একাধিক পরিবহন-সংশ্নিষ্ট সূত্র অবশ্য জানায়, গুজব নয়, বরং ইন্ধনেই গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়েছে। সূত্র জানায়, মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশের পক্ষ থেকে আগেই সিদ্ধান্ত হয়, যেদিন থেকে আইন কার্যকর করা হবে, সেদিন রাজধানী ঢাকা বাদে দূরবর্তী কিছু জেলা শহরে 'পরীক্ষামূলকভাবে' গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখা হবে। এর মাধ্যমে সরকারের পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া আসে, তা দেখে কেন্দ্র্রীয়ভাবে বৈঠক করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সে সিদ্ধান্তের আলোকেই গতকাল দক্ষিণাঞ্চলের খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, মাগুরা, মেহেরপুর, নড়াইল, টাঙ্গাইল এবং উত্তরের রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ- এমন ১২ জেলায় বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়। মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, চালকরা কঠোর আইনে ভীত হয়ে রাস্তায় নামতে চাইছেন না। এর আগে সাভারে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে এক ট্রাকচালক একজন নারীকে চাপা দিয়ে হত্যার প্রায় ১৪ বছর পর ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালতের রায়ে সেই চালককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে তার প্রতিবাদেও একইভাবে 'শ্রমিকরা গাড়ি চালাতে চাচ্ছে না'- এমন কৌশল নিয়ে হঠাৎ পরিবহন ধর্মঘট ডেকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল। অবশ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি শাজাহান খান বলেন, আগামী ২১ ও ২২ ডিসেম্বর শ্রমিক ফেডারেশনের তত্ত্বাবধানে দেশের বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক হবে। ওই বৈঠক থেকেই নতুন আইন কার্যকর-সংক্রান্ত পরিস্থিতিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তিনি বলেন, গতকাল দেশের কয়েকটি স্থানে হঠাৎ করে শ্রমিকদের বাস-ট্রাক না চালানোর সিদ্ধান্ত ফেডারেশনের নয়। নানা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে কোথাও কোথাও বাস চলাচল বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্যা বলেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে মূলত গুজবের কারণেই গাড়ি বন্ধ হয়েছে। সরকারবিরোধী কোনো মহল সরকারকে বিব্রত করার জন্য নতুন পরিবহন আইন কার্যকর করা নিয়ে নানামুখী গুজব ছড়াতে পারে। যেমন- ঢাকায় বলাকা পরিহনের একটি বাসে জরিমানা নিয়ে গুজবকে কেন্দ্র করে সংকট তৈরির চেষ্টা হয়েছিল। মালিক সমিতির নজরে আসার পর খোঁজ নিয়ে তার সমাধান করা হয়েছে। তিনি বলেন, মালিক সমিতি নতুন আইনের বিরুদ্ধে নয়, তবে আইনটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হোক, এটাই চায়। এ ব্যাপারে 'নিরাপদ সড়ক চাই' আন্দোলনের প্রধান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, গুজব কারা ছড়াচ্ছে, ইন্ধন কারা দিচ্ছে- তাদের চিহ্নিত করে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কারণ খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেসব স্থানে গাড়ি বন্ধ হচ্ছে, সেখানকার শ্রমিকরা বলছেন, ওপরের নেতাদের নির্দেশে তারা গাড়ি বন্ধ রাখছেন। এই ওপরের নেতা কারা, সেটা সবাই জানে। এর আগেও একাধিকবার এভাবে ওপরের নেতারা আকস্মিক ধর্মঘট ডেকে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার কৌশল নিয়েছেন। ইলিয়াস কাঞ্চন আরও বলেন, নতুন আইনে বলা হয়েছে, চালকের নিয়োগপত্র না থাকলে মালিক ও চালক উভয়কে জরিমানা করা হবে। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চালকদের নিয়োগপত্র নেই। এ কারণে যারা নিয়োগপত্র না দিয়ে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রাখতে চান, তারাই নানা কৌশলে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে নতুন আইন কার্যকরে বাধা সৃষ্টি করছেন। তিনি বলেন, সরকারের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সড়কে নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলার স্বার্থে যারা আইন কার্যকরে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান, কিছুটা ভোগান্তি সহ্য করে হলেও নতুন আইন বাস্তবায়নে সরকারকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া। পরিবহন নেতারা কত দিন পরিবহন বন্ধ রাখতে চান, সেটাও দেখা যাক। ভোগান্তির কারণে গণপরিবহনের স্বার্থান্বেষী মহলের কাছে নতিস্বীকার করা নয়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, গণপরিবহনে যে সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন থেকে যাত্রীদের জিম্মি করে লুটপাট চালিয়ে যাচ্ছে, সেই সিন্ডিকেটই এখন নতুন আইন কার্যকরে বাধার সৃষ্টি করছে। তারা সরকারের ভালো কাজের সমর্থন করে না, যাত্রীদের যথাযথ সেবা দেওয়ার কথা চিন্তা করে না, শুধু লুটপাটের চিন্তায় ব্যস্ত। সরকারের উচিত, এই সিন্ডিকেটের হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। তিনি বলেন, ১৪ মাস আগে এই আইন পাস হয়েছে। এত দিনেও কেন আইন সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করা হয়নি? বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান বলেন, নতুন আইনের গেজেট বিআরটিএতে এসে পৌঁছেছে রোববার সন্ধ্যায়। এ অনুযায়ী গতকাল থেকে আইন কার্যকর শুরু হয়েছে। তিনি জানান, গতকাল বিআরটিএ ঢাকায় সাতটি ও চট্টগ্রামে আটটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে। রাজধানীতে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৮৮টি মামলা দিয়েছে বলে বিকেল পর্যন্ত তথ্য এসেছে। জরিমানা করা হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার টাকা। এদিকে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিকেলে বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে মালিক সমিতির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন বলেন, নতুন সড়ক আইন কার্যকর করা নিয়ে ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ আইনে বলা হয়েছে, কাভার্ডভ্যানের আকৃতি পরিবর্তন করা যাবে না। এখন বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী কাভার্ডভ্যানের দৈর্ঘ্য হবে ২০ ফুট; কিন্তু বিদেশ থেকে যে কাভার্ডভ্যান আসে, তার দৈর্ঘ্য ২২ ফুট। এত দিন ২২ ফুটই চলেছে। নতুন আইন প্রয়োগ করা হলে বিনা কারণে মালিক-শ্রমিকরা জেল-জরিমানার শিকার হবেন। তিনি আরও বলেন, এ ছাড়া বাংলাদেশে শ্রমিকদের দিয়ে মালামাল ওঠানামা করার কারণে কাভার্ডভ্যানে অতিরিক্ত সিঁড়ি লাগাতে হয় বাধ্য হয়ে। বিদেশে মেশিন দিয়ে মালামাল ওঠানামা করানো হয়, যে কারণে সেখানে অতিরিক্ত সিঁড়ি সংযোজনের প্রয়োজন হয় না। ঢাকার বাইরে ধর্মঘট নিয়ে জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- খুলনা: গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় নগরীর সোনাডাঙ্গা আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সেখান থেকে কোনো রুটেই বাস ছাড়ছে না। ট্রাফিক আইল্যান্ডের পাশে ব্যাগ-ব্যাগেজ নিয়ে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। পরিবহন শ্রমিকদের বেশ কয়েকজন টার্মিনালের মধ্যে ক্রিকেট খেলছেন। ইসমাইল হোসেন নামের এক যাত্রী বলেন, তিনি সাতক্ষীরার শ্যামনগরে যাবেন। কিন্তু কোনো বাস যাচ্ছে না। এখন তিনি বাসায় ফিরে যাচ্ছেন। ছেলেমেয়েকে নিয়ে বাস কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শেফালী বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তারা ঢাকায় যাবেন। বাস না চলায় যেতে পারছেন না। কবে থেকে বাস চলবে তাও কাউন্টার থেকে কেউ বলতে পারছেন না। তবে ঈগল, হানিফ, সোহাগ ও একে ট্রাভেলসের রয়্যাল কাউন্টারের কর্মচারীরা জানান, ভোরে ঢাকা রুটে তাদের বাসগুলো ছেড়ে যায়। সেগুলো যশোরের নিউমার্কেট এলাকায় পরিবহন শ্রমিকরা আটকে দেন। এরপর থেকে তারা আর কোনো বাস ছাড়েননি। খুলনা জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ মালিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক আনোয়ার হোসেন সোনা বলেন, পরিবহন শ্রমিকরা জরিমানা ও সাজার ভয়ে গাড়ি চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। আমাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই তারা এসব করছেন। রাজশাহী: গতকাল সকাল থেকে বিভিন্ন রুটের বাস চলাচল বন্ধ করে দেন শ্রমিকরা। ফলে রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও নাটোর রুটে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। দু-একটি বাস ছাড়ার চেষ্টা করলেও শ্রমিকরা যাত্রীদের নামিয়ে দেন। এতে দুর্ভোগে পড়ে মানুষ। তবে সকালে ঢাকাগামী বেশ কয়েকটি বাস রাজশাহী থেকে ছেড়ে যায়। নগরীর শিরোইল ও নওদাপাড়া বাস টার্মিনাল এবং ভদ্রা মোড়ে অবস্থান নিয়ে মোটর শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রত্যাহারের দাবি জানান। জেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে ডাকা কোনো ধর্মঘট নয়। সকাল থেকে শ্রমিকরা নিজেরাই বাস বন্ধ রেখেছেন। তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি এটাকে সমর্থন করি না। প্রতিবাদ জানানোর আরও ভাষা আছে। এভাবে বাস বন্ধ করে যাত্রীদের দুর্ভোগে ফেলা সমর্থনযোগ্য নয়। বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুর রহমান পিটার বলেন, নতুন আইনে সাজার ভয়ে বাস চালকরা এখন পেশা পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন। তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে অবৈধ যান চলে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেই। শ্রমিকরা বেতন পান ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। দুর্ঘটনা হলে জরিমানা দিতে হবে ৫ লাখ টাকা। এত টাকা তারা কোথায় পাবেন? রাজশাহী নগর পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার অনির্বাণ চাকমা বলেছেন, নতুন আইন বাস্তবায়নে এখনও পুলিশ মাঠে নামেনি। আইনটি অনেক কঠোর হওয়ায় পুলিশ এখনও মানুষকে সচেতন করার কাজ করছে। তিনি বলেন, নতুন আইন হওয়ায় পুরোনো আইন গত ১ নভেম্বর থেকেই বিলুপ্ত। তাই পুরোনো আইনেও কোনো সাজা দেওয়া হচ্ছে না। তবে একেবারে গায়ে পড়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটালে বা আইন অমান্য করলে পুলিশ নতুন আইনে সাজা দিচ্ছে, সেটাও একেবারে নগণ্য। যশোর: দ্বিতীয় দিনের মতো বাস চলাচল বন্ধ রেখেছেন যশোরের পরিবহন শ্রমিকরা। ফলে গতকালও দূরপাল্লার ১৮টি রুটে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই শ্রমিকদের ডাকা আকস্মিক এই ধর্মঘটে বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছেন ভারত থেকে ফেরা পাসপোর্ট যাত্রীরা। নড়াইলের বরদিয়া গ্রামের শুভ্র মণ্ডল পাঁচ দিনের ভারত সফর শেষে গতকাল বেনাপোল দিয়ে এপারে আসেন। বাস বন্ধ থাকায় সেখানেই আটকা পড়ে আছেন তিনি। তবে বেনাপোল ইমিগ্রেশনের এক কর্মকর্তা জানান, ঢাকাসহ উত্তরবঙ্গগামী যাত্রীরা ঠাসাঠাসি করে হলেও ট্রেনে রওনা হচ্ছেন। মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার স্কুলশিক্ষিকা নার্গিস আক্তার তার মাকে নিয়ে অসুস্থ বোনকে দেখতে দু'দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলেন যশোর সদরের খোজারহাট গ্রামে। ছুটি শেষ হলেও ফিরতে না পেরে বিপাকে পড়েছেন তিনি। কোতোয়ালি থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, দূরপাল্লার গাড়ি ছাড়ার পয়েন্টগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের টহল অব্যাহত রয়েছে। জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মামুনুর রশিদ বাচ্চু বলেন, ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়ে রাস্তায় নামতে নারাজ শ্রমিকরা। তাই স্বেচ্ছায় যান চলাচল বন্ধ রেখেছেন সাধারণ শ্রমিকরা। কুষ্টিয়া: কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী কিছু বাস চলাচল করলেও অধিকাংশই বন্ধ রয়েছে। মিরপুর থেকে আসা যাত্রী রিপন ও আনিস জানান, বাস না চলায় ইজিবাইকে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে। এতে সময় ও ভাড়া বেশি লাগছে। জেলা বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সভাপতি আজগর আলী বলেন, চালক ও শ্রমিকরা কাজে আসছেন না। তাদের অনেকের কাগজপত্র ঠিক নেই। বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করছি। শিগগির সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছি। মাগুরা: শহরের ভায়না মোড় বাস কাউন্টারের স্ট্যাটার নবাব আলী বলেন, এ ধর্মঘটের সঙ্গে তাদের মালিকপক্ষের সংশ্নিষ্টতা নেই। দুর্ঘটনায় মৃত্যুজনিত কারণে চালকের বিরুদ্ধে সরকার জেল-জরিমানার নতুন আইন করায় তারা এ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন। তবে মাগুরা-যশোর সড়কে বাস চলাচল বন্ধ থাকলেও ঢাকাগামী পরিবহন ও জেলার অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। কলেজছাত্র ইমন মিয়া ও চাকরিজীবী আকরাম হোসেন জানান, তাদের প্রতিদিন যশোর-মাগুরা যাতায়াত করতে হয়। মাগুরা থেকে যশোরের বাসভাড়া ৬০ টাকা হলেও এখন একশ' থেকে দেড়শ' টাকা দিয়ে ইজিবাইক, টেম্পো অথবা অটোরিকশায় করে যাতায়াত করতে হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা: ধর্মঘটের কারণে সাধারণ মানুষকে মহাভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। তারা ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ যানবাহনে যাতায়াত করছেন। তারা বলছেন, একদিকে হয়রানি, অন্যদিকে সময় ও বাড়তি ভাড়া লাগছে। জেলা বাস-ট্রাক মালিক-শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক রিপন মণ্ডল বলেন, আমরা ধর্মঘট ডাকিনি। সাধারণ শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করছেন। মেহেরপুর: দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাস না চালানোর সিদ্ধান্ত নেন চালকরা। ফলে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর-কুষ্টিয়া, মেহেরপুর-মুজিবনগর সড়কে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। আকস্মিক বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাধারণ যাত্রীরা সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকে অবৈধ যান নছিমন, করিমন, ইজিবাইক, আলগামনসহ নানাভাবে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। নড়াইল: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও নড়াইল জেলা বাস-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান জানান, বাস বন্ধ রাখার ব্যাপারে সংগঠনের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমাদের সঙ্গে আলাপ না করে চালক-শ্রমিকরা বাস চালানো বন্ধ করে দিয়েছেন। সাতক্ষীরা: হঠাৎ করে সাতক্ষীরার সব রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় হাজার হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েছেন। তারা অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে নছিমন, করিমন ও ইজিবাইকে করে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যক্ষ আবু আহমেদ বলেন, শ্রমিকরা চান আইনটি সংশোধন করে বাস্তবায়ন করা হোক। শ্রমিকরা বাস চালানো বন্ধ করে দিলে মালিকপক্ষের তো কিছু করার থাকে না। ঝিনাইদহ: ঝিনাইদহ থেকে যশোরগামী যাত্রী রবিউল ইসলাম বলেন, ভিসার আবেদন করতে আমাকে যশোর যেতে হবে। সকাল থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা বসে আছি, বাস পাচ্ছি না। রাশেদ নামের আরেক যাত্রী বলেন, সরকার একটি আইন করেছে। বাস মালিক ও শ্রমিকরা সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে বসে আছেন। এতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। টাঙ্গাইল: সকাল থেকে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভূঞাপুর থেকে ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলরত সব ধরনের যানবাহন চালানো বন্ধ রাখেন শ্রমিকরা। ফলে ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। যাত্রীরা জানান, মানুষকে জিম্মি করে এভাবে অঘোষিত কর্মবিরতি পালন করা উচিত নয়। আগে থেকে ঘোষণা দিলে তারা বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারতেন। জেলা পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক চিত্তরঞ্জন বলেন, শ্রমিকদের এ কর্মবিরতির সঙ্গে ইউনিয়নের কোনো সম্পর্ক নেই। চাঁপাইনবাবগঞ্জ: রাজশাহী-সোনামসজিদ রুটে বিকেল ৩টা পর্যন্ত বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল। এরপর বন্ধ হয়ে যায়। সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি লুৎফর রহমান জানান, মালিকরা বাস রাস্তায় রেখেছেন। শ্রমিকরা গাড়ি চালাতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
পড়া হয়েছে 25 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: মঙ্গলবার, 19 নভেম্বর 2019 15:32