12122019বৃহঃ
শিরোনাম:
রবিবার, 10 নভেম্বর 2019 09:46

সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল

লিখেছেন 
আইটেম রেট করুন
(0 ভোটসমূহ)
নিউজ ফ্ল্যাশ ডেস্ক শেষ পর্যন্ত দুর্বল হয়ে বাংলাদেশের সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল'। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, গতকাল শনিবার রাত ৯টায় পশ্চিমবঙ্গ ও খুলনা উপকূলে আঘাত করে ঘূর্ণিঝড়টি। পরে আরও দুর্বল হয়ে মধ্যরাতে সুন্দরবনের ওপর দিয়ে উপকূল অতিক্রম করার কথা। ঝড়ের প্রভাবে পাঁচ থেকে সাত ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হলেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে গতকাল দিনভর বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার জনজীবন ছিল বিপর্যস্ত। ব্যাহত হয় যোগাযোগ ব্যবস্থা। বুলবুলে ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা ছিল সর্বত্র। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় নেওয়া হয় ব্যাপক প্রস্তুতি। উপকূলের ২১ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয় নিরাপদ আশ্রয়ে। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল'-এর কারণে গতকাল সকাল থেকে মোংলা, পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং আশপাশের এলাকা, দ্বীপ ও চরে দিনভর জারি ছিল ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। সারাদেশে নৌ চলাচল ছিল বন্ধ। উপকূলের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। প্রাণহানির খবর পাওয়া না গেলেও বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক জানান, সুন্দরবন উপকূলে আঘাত হানার সময় ঝড়ের কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার; যা দমকা ও ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঘণ্টায় আট কিলোমিটার গতিতে এগোচ্ছিল 'বুলবুল'। স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, আঘাত হানার সময় উপকূলে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যায়। সঙ্গে ছিল বৃষ্টি। নানা জায়গায় গাছ পড়েছে। উপকূলের চরাঞ্চলে কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ২০০৯ সালের মে মাসে খুলনা উপকূলে আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় আইলা। সুন্দরবনে বাধা পাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মত, এবারও ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল থেকে উপকূলকে বাঁচিয়েছে সুন্দরবন। আবহাওয়াবিদ আরিফ হোসেন বলেন, ঘূর্ণিঝড়টির ব্যাস ছিল ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়টি উপকূলে আঘাত হানার সময় স্থানীয় নদ-নদীগুলো এবং সাগরে জোয়ারের পানি বৃদ্ধির প্রভাবে জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা বেশি ছিল। ঘূর্ণিঝড়টি দেশের মধ্যাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাবে। এর প্রভাবে আজ রোববার ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি বৃষ্টি হতে পারে। গতকাল সন্ধ্যায় বুলবুল স্থলভাগে উঠতে শুরু করে। তখন ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১১০ থেকে ১৩০ কিলোমিটার। তবে উপকূলের ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে প্রবেশের পথে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি কিছুটা কমে যায়। ঝড়ের প্রভাবে কলকাতা এবং ওডিশায় দু'জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে ভারতীয় গণমাধ্যম। বারবার গতিপথ বদল করে বুলবুল বেকায়দায় ফেলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের। প্রথমে বলা হয়েছিল ওডিশায় যাবে 'বুলবুল'। পরে পথ বদলে বাংলাদেশের দিকে আসে। তবে ঠিক কোথায় গিয়ে আঘাত হানবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারছিলেন না আবহাওয়াবিদরা। বিকেলে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপের দিকে বাঁক নেয়। ঝড়ের কারণে গতকাল চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ ছিল। দিনভর সেখানে ছিল ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত। সাগর ছিল খুবই বিক্ষুব্ধ। মহাবিপদ সংকেত জারির পর সমুদ্রবন্দরগুলোতে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ঝড়-পরবর্তী দ্রুত সময়ে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনায়ও সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহাদাৎ হোসেন সমকালকে জানান, ২১ লাখ মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ জন্য নিকটস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগানো হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বিঘ্নিত হয় বিমান চলাচলও। সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান সমকালকে বলেন, চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শনিবার সকাল থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। যশোর, বরিশাল ও সিলেট বিমানবন্দরকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে শনিবার সকাল থেকে ফ্লাইট উড্ডয়ন ও অবতরণ বন্ধ ছিল। টানা বৃষ্টিতে রাজধানীসহ সারাদেশে ভোগান্তি ছাড়াও অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগও স্থবির হয়ে পড়ে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে আগামীকাল সোমবারের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছ। এর আগে শনিবারের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়। উপকূলীয় ১৪টি জেলায় আগামীকাল সোমবারের সব সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সর্বাত্মক প্রস্তুতি :ঘূর্ণিঝড়ের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় ও তাৎক্ষণিক জরুরি ব্যবস্থা নিতে উপকূলীয় জেলা-উপজেলায় কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীকেও প্রস্তুত রাখা হয় বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে জরুরি বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী জানান, উপকূলীয় ১৩টি জেলার ৪১টি উপজেলায় ৫৫ হাজার ৫১৫ জন স্বেচ্ছাসেবককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে দুর্গম এলাকা থেকে জনগণকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিতে নৌকা, ট্রলারসহ প্রয়োজনীয় যানবাহনের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বেড়িবাঁধ, ফসল, গবাদিপশু, মৎস্যসম্পদ ইত্যাদি ক্ষতি রোধে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে। এদিকে প্রবল ঘূর্ণিঝড় 'বুলবুল' মোকাবিলায় সম্ভাব্য ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকাগুলোতে স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে। জরুরি উদ্ধার, ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তায় ১০টি নৌবাহিনীর জাহাজসহ নৌ কন্টিনজেন্ট ও মেডিকেল টিম মোতায়েন রাখা হয়েছে বলে জানায় আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। বুলবুলের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় চট্টগ্রামে ৪৭৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করে রাখা হয়। এ ছাড়া প্রায় চার হাজার স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করার কথা। এরপর থেকে উপকূলের লোকজনকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে মাইকিং করা হলেও তারা আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে না। স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে চট্টগ্রাম বন্দর জেটি থেকে সব জাহাজ নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা নিরাপদে রাখা হয়েছে। পণ্য ওঠানামার কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। সারাদেশের চিত্র :শতাধিক জাহাজ অন্তত ২০ লাখ টন পণ্য নিয়ে সাগরে ভাসছে। এসব পণ্যের বেশিরভাগই ভাসছে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে। সেখানে ৭১টি বিদেশি বড় জাহাজে ভাসছে ১৯ লাখ টন পণ্য। আর ৮০ হাজার টন পণ্য ভাসছে অর্ধশত ছোট লাইটারেজ জাহাজে। কর্ণফুলী নদীসহ দেশের বিভিন্ন ঘাটে ভাসছে এসব লাইটারেজ জাহাজ। ঘূর্ণিঝড়ের খবর পাওয়ার পর থেকেই খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের সবচেয়ে বেশি ভয় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নিয়ে। এরই মধ্যে বিকেল ৪টার পর থেকে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে জেলায় ৩৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা বরগুনায় ৩৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের অবস্থা ঝুঁকিপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত তীব্র হলে কী হবে, এ আশঙ্কায় দিন কেটেছে বাঁধ এলাকার লক্ষাধিক বাসিন্দার। দ্বীপজেলা ভোলার প্রায় ২০ লাখ মানুষের সারাদিন কেটেছে উৎকণ্ঠায়। দিনভর ছিল মাঝারি বৃষ্টি, সঙ্গে বাতাস। লঞ্চ ও ফেরি চলাচল বন্ধ থাকায় সারাদেশের সঙ্গে ভোলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নিরাপদে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বৃহস্পতিবার রাত থেকেই খুলে দেওয়া হয়েছে জেলার ৬৬৮টি আশ্রয়কেন্দ্র। প্রায় এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ গতকাল দুপুরের মধ্যেই বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে এসে আটকা পড়েন দেড় হাজার পর্যটক। গত দু'দিন ধরে বৈরী আবহাওয়া ও ৪ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় টেকনাফ থেকে কোনো জাহাজ ছাড়েনি। এতে তারা দ্বীপে আটকা পড়েছেন। ঝড়ের কারণে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ যাতায়াতে ছয়টি ফেরিঘাট বন্ধ রাখা হয়েছে। এই দ্বীপে যাতায়াতের একমাত্র পথ এই ফেরিঘাটগুলো। সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত এসব ফেরিঘাট শনিবার সকাল থেকে বন্ধ রাখা হয়। সাতক্ষীরায় ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত ঘোষণার পর থেকেই স্থানীয়দের আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। সকাল থেকেই জেলা প্রশাসন বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করলেও গ্রামবাসী অনেকে তাদের বাড়িঘর ছাড়তে রাজি হচ্ছিল না। পরে পুলিশ, বিজিবি, নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সহায়তায় অনেককে জোর করেই নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে আনা হয়েছে। জেলার ২৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই হয়েছে লক্ষাধিক মানুষের। বুলবুলের প্রভাবে নদী উত্তাল থাকায় নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর থেকে শরীয়তপুর, চাঁদপুরসহ সাতটি রুটের শতাধিক লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধারে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে উদ্ধারকারী জাহাজ 'প্রত্যয়' প্রস্তুত রাখা হয়।
পড়া হয়েছে 14 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: রবিবার, 10 নভেম্বর 2019 09:56

এ বিভাগের সর্বশেষ সংবাদ

ফেসবুক-এ আমরা