08182019রবি
বুধবার, 07 আগস্ট 2019 10:16

ডেঙ্গুতে একদিনে ১০ রোগীর মৃত্যু

লিখেছেন 
আইটেম রেট করুন
(0 ভোটসমূহ)
নিউজ ফ্ল্যাশ প্রতিবেদক ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের মৃত্যু বাড়ছে। গত ২৪ ঘন্টায় ১০ ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গুর বিস্তার অব্যাহত। রোগীতে ঠাসা দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো। এমনকি সরকারি হাসপাতালগুলোর খালি স্থানে অতিরিক্ত বেডের (শয্যা) ব্যবস্থা করেও ঠেকানো যাচ্ছে না রোগীর ঢল। বেড না পেয়ে রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি এখন প্রতিদিনের চিত্র। আর এ মুহূর্তে ডেঙ্গুজ্বরের বিস্তার শুধু আক্রান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, প্রতিদিনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অনেকে। দীর্ঘ হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর মিছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় কমপক্ষে আরও ১০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যাদের মধ্যে তিন শিশুসহ প্রবাসী এক নারী রয়েছেন। এ নিয়ে ছয় দিনে ২৭ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। যদিও প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে এখন পর্যন্ত এসব মৃত্যুর অধিকাংশই সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে এ তালিকায় জানুয়ারি থেকে ৬ আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২৩ জন। পাশাপাশি এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৯৯২ জনে। এর মধ্যে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৩৪৮ জন। তবে বেসরকারি হিসাবে এই মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। এদিকে ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে শক সিনড্রম বেড়ে যাওয়ায় মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে আরও ৫০টি শয্যা সংযুক্ত করা হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে ন্যাশনাল গাইডলাইন অনুসরণের নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হঠাৎ মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ গণমাধ্যমকে বলেন, ডেঙ্গুর সেরোটাইপ-৩ একটু বিপজ্জনক। এর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং দ্রুত তার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে। এ ছাড়া অনেক রোগী অবহেলা করে সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নেয়ায় মৃত্যুর ঘটনা বাড়ছে। পাশাপাশি সব হাসপাতালের চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থাও উন্নত নয়। তাছাড়া এবার আক্রান্তের সংখ্যা যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুই শিশুসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু ঘটেছে। এদের মধ্যে রাজধানীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিনজন, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন, দিনাজপুর, রংপুর, মানিকগঞ্জ, চট্টগ্রামের হাটহাজারী এবং চাঁদপুরে একজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, তারা হলেন- মনোয়ারা বেগম (৭৫), আমজাদ মণ্ডল (৫২) ও হাবিবুর রহমান (২১)। ঢামেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নাছির উদ্দীন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ নিয়ে ঢামেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১৭ জনে। মঙ্গলবার ভোর চারটার দিকে ঢামেকের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মনোয়ারা বেগম। তার স্বামীর নাম আবদুল হাই। তারা ঢাকার মিরপুর এলাকায় থাকতেন। মনোয়ারার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর হাজীগঞ্জের আহমদপুরে। মনোয়ারার ছেলে মোশাররফ হোসেন জানান, তার মা এক সপ্তাহ ধরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। ৩ আগস্ট তাকে ঢামেকে ভর্তি করা হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর চারটার দিকে তার মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার সকাল পৌনে ৬টার দিকে ঢামেকের মেডিসিন বিভাগের ৬০১নং ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আমজাদ মণ্ডল। তার বাড়ি মানিকগঞ্জের শিবালয়ের কেটুয়াধারা গ্রামে। তার ছোট ভাই রাশেদ মণ্ডল জানান, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে শুক্রবার তার ভাইকে মানিকগঞ্জ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে সোমবার রাতে ঢামেকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার তার মৃত্যু হয়। একইদিন দুপুর পোনে ৩টায় ঢামেকের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাবিবুর রহমান (২১) নামে এক যুবক মারা যান। তার বাড়ি ফরিদপুরের ভাঙ্গা থানায়। তিনি ৩১ জুলাই থেকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। এছাড়া স্বামী-সন্তান নিয়ে দেশে বেড়াতে এসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সোমবার রাতে ঢাকার আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে মারা যান ইতালি প্রবাসী হাফসা লিপি (৩৪)। হাসপাতালের পরিচালক জসিমউদ্দিন খান জানান, ওই নারী চার দিন ধরে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আইসিইউতে থাকাবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। হাফসার স্বামী সরদার আবদুল সাত্তার তরুণ (৩৬) নিজেও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দুই সন্তান অলি (১২) ও আয়ানকে (৬) নিয়ে প্রায় তিন সপ্তাহ আগে দেশে এসে কলাবাগানে ওঠেন তারা। রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন (৭) নামে এক মাদ্রাসা ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। আল মামুনের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, চার দিন আগে জ্বর নিয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হয় আল মামুন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানা যায়, সে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। আল মামুন পরিবারের সঙ্গে সবুজবাগ মাদারটেক এলাকায় বসবাস করত। এদিকে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক কিশোরের মৃত্যু হয়েছে। রবিউল ইসলাম (১৭) ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ গ্রামের নয়ন ইসলামের ছেলে। মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. আবু মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মানিকগঞ্জ মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাজু খান (৪০) নামের এক ব্যক্তি মারা গেছেন। তার বাড়ি হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামে। গত ৩ আগস্ট রাজু খান জ্বর ও সার্জিক্যাল সমস্যা নিয়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে সোমবার ভোর ৫টার দিকে তার মৃত্যু হয়। মুন্নু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মাহাবুবুল হাসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। রাজুর স্ত্রী লাইলী বেগম অভিযোগ করেন, চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজুর অবস্থার অবনতি ঘটলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাজুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় কোনো সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর না করে হাসপাতালেই রাখে। পরে সোমবার ভোররাতে তার মৃত্যু হয়। এদিকে রংপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুই দিনে মারা গেছে দুই শিশু। মঙ্গলবার সকালে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার নাকাইহাট গ্রামের আশরাফুল ইসলামের মেয়ে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের মুখপাত্র ডা. সাইদুজ্জামান। তিন দিন চিকিৎসাধীন থেকে মঙ্গলবার সকালে তার মৃত্যু ঘটে। এটিই রমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া প্রথম কোনো রোগী। এছাড়া সোমবার বিকালে রংপুরের মিঠাপুকুরে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে তিশামণি (৪) নামে এক শিশু মারা গেছে। সে উপজেলার কৃষ্ণপুর তেঁতুলবাড়ি গ্রামের তাহারুল ইসলামের মেয়ে। বিষয়টি নিশ্চিত করে গোপালপুর ইউপি চেয়ারম্যান আমিরুল পাইকাড় দীলিপ জানান, ২ আগস্ট ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয় তিশা। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি গেলে রোববার বিকালে তার মৃত্যু হয়। হাটহাজারী প্রতিনিধি জানান, হাটহাজারীতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে শারমিন আকতার (২১) নামে এক গৃহবধূ মারা গেছেন। নিহত ওই গৃহবধূ ফতেপুর ইউনিয়নের ভাবানিপুর সৈয়দ কোম্পানির বাড়ির মো. লিটনের স্ত্রী। তিনি ২ পুত্র সন্তানের জননী। মঙ্গলবার (৬ আগস্ট) বিকাল ৩টার দিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম শহরে নেয়ার পথে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত ওই গৃহবধূর মৃত্যু হয়। বর্তমান পরিস্থিতি : স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ২,৩৪৮ জন ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে রাজধানীতে ১,২৭৮ জন এবং আটটি বিভাগে ১,০৬৪ জন। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২৯ হাজার ৯১২ জন।
পড়া হয়েছে 14 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: বুধবার, 07 আগস্ট 2019 10:31