06172019সোম
শুক্রবার, 29 মার্চ 2019 10:28

এফ আর টাওয়ার পুড়ে অঙ্গার, নিহত ১৯

নিউজ ফ্ল্যাশ প্রতিবেদক চুড়িহাট্টার আগুন লাগার অল্প সময়ের মধ্যে ঢাকায় ঘটল আরেকটি বিভীষিকাময় অগ্নিকাণ্ড। গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার আগুন কেড়ে নেয় ৭১ জনের প্রাণ। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে আকাশচুম্বী ফারুক রূপায়ণ (এফ আর) টাওয়ারে আগুন কেড়ে নিল এক বিদেশি নাগরিকসহ ১৯ জনের জীবন। রাত ২টায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছিল। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসাইন জানান, এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ১৯। তিনি এফ আর টাওয়ারের ভেতরে গিয়েছিলেন। দেখেছেন সেখানে অগ্নিনির্বাপণের কিছু যন্ত্রপাতি ছিল। তবে সেগুলো ব্যবহারোপযোগী ছিল না। অগ্নিকাণ্ডে আহত ও দগ্ধ হয়েছেন অন্তত ৭০ জন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্নিষ্টরা। হতভাগ্যদের কারও মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে, ধোঁয়ায় শ্বাসরোধে ও বাঁচার জন্য ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্য সব দিনের মতোই গতকালও কর্মচঞ্চল ছিল কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসটিতে সাম্প্রতিককালে বাণিজ্যিক হয়ে ওঠা ওই এলাকার প্রায় সব বহুতল ভবনে কর্মীরা যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আশপাশের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়েও ছিল শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি। এমন পরিবেশে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ 'আগুন আগুন' বলে চিৎকার শুরু হয়। আতঙ্ক ও উদ্বিগ্ন লোকজন দেখেন, কামাল আতাতুর্ক এভিনিউর ৩২ নম্বর এফ আর টাওয়ার থেকে বেরিয়ে আসছে আগুনের লেলিহান শিখা। এরপরই শুরু হয় দৌড়াদৌড়ি। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে ২২ তলাবিশিষ্ট ওই ভবনে। হঠাৎ পাল্টে যায় বনানীর দৃশ্যপট। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয় ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকাজে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ও বিমানবাহিনীর পাঁচটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। ভবনটির ছাদে আটকে পড়া অনেককে উদ্ধার করে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার। এ ছাড়া অগ্নিনির্বাপণে হেলিকপ্টার থেকে ভবনটিতে পানিও ফেলা হয়েছে। দুর্ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে চার কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করেছে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। অগ্নিকাণ্ডের ফলে পাশের ভবনে অবস্থিত দুরন্ত ও রেডিও টুডের সম্প্রচার বন্ধ ছিল। ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড প্ল্যানিং) সিদ্দিক মো. জুলফিকার আহমেদ বলেন, ২২ তলা এই ভবনটিতে অগ্নিনির্বাপণের জন্য নিজস্ব ব্যবস্থা ছিল না। ভবনের যতদিন নিজস্ব সক্ষমতা না থাকবে, ততদিন এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আর দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের সংখ্যাও বেশি হবে। তিনি বলেন, আগুন ৯৫ ভাগ নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ভেতরে তাপমাত্রা অনেক উচ্চ থাকায় কিছু জায়গায় আগুন জ্বলছে। তাদের ইউনিটগুলো পানি ব্যবহার করে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। রেসকিউ টিম প্রতিটি তলায় যাচ্ছে। ভেতরে কেউ হতাহত থাকলে তাদের উদ্ধার করা হবে। ভবনটির পাঁচ-সাতটি তলা আগুনে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৯/১০ তলা থেকে শুরু করে ওপরের দিকে ক্ষতি বেশি হয়। কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষ পরিমাণ নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। জুলফিকার আহমেদ বলেন, কী কারণে আগুন লেগেছে, তা এখনই নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এ ধরনের ভবনে সাধারণত বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবন তৈরির সময় বিল্ডিং কোড না মানলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। আগুন লাগার কারণ ও করণীয় সম্পর্কে তারা সুপারিশ করবে। এ ধরনের অবহেলা ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। আর ছাড় দেওয়া হবে না। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব, রেড ক্রিসেন্ট অনেক কিছু করেছে। অনেক প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক ছিল। আইএসপিআরের পরিচালক লে. কর্নেল আবদুল্লাহ ইবনে জায়েদ বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পরপরই সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। বিমানবাহিনীর পাঁচটি হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে আটজনকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) আনা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে এক শ্রীলংকানসহ পাঁচজনের লাশও সিএমএইচে আনা হয়। অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের দেখতে রাতে কুর্মিটোলা হাসপাতালে যান ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ভবনটির ইমার্জেন্সি কলাপসিবল গেট বন্ধ ছিল। সে কারণে উদ্ধার কাজ বিঘ্নিত হয়েছে। এছাড়া ভবনটির সিঁড়িটা ছিল সরু। জীবন বাঁচাতে ঝুঁকিপূর্ণ লাফ :এফ আর টাওয়ারের পাশের একটি ভবনের নিরাপত্তাকর্মী শরিফুল ইসলাম জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ আগুন আগুন বলে চিৎকার শুনতে পান। বাইরে তাকিয়ে দেখেন এফ আর টাওয়ারের একটি ফ্লোর থেকে আগুনের ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে। আতঙ্কে লোকজন দিজ্ঞ্বিদিক দৌড়াদৌড়ি করছিলেন। এফ আর টাওয়ার থেকে তার বেয়ে কয়েকজন নেমে আসছিলেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন আবার তার ছিঁড়ে ছিটকে পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান। এফ আর টাওয়ারের পাশের ভবনের নাম আহমেদ টাওয়ার। ওই টাওয়ারের ফ্লোর ইনচার্জ ফজলে রাব্বী বলেন, আগুন লাগার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আহমেদ টাওয়ার থেকে সবাইকে দ্রুত বের করে আনা হয়। এরপর এফ আর টাওয়ারে আটকা পড়া লোকজনকে উদ্ধার করতে ঢোকেন। সিঁড়িতে গিয়ে দেখেন ধোঁয়া। কয়েকজনকে ধরাধরি করে আনতে গিয়ে পায়ে ব্যথা পান তিনি। তার দাবি, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বেশ কিছু সময় পানির উৎস খুঁজতে থাকেন। এতে অনেক সময় ব্যয় হয়। পরে পানির উৎস পাওয়ার পর আগুন নেভাতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েন। এক শ্রীলংকান নাগরিকও বাঁচতে গিয়ে লাফিয়ে পড়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এফ আর টাওয়ারের সপ্তম ও অষ্টমতলায় আগুন লাগার পর ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে অনেকে বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়তে থাকেন। উদ্ধার অভিযান :অগ্নিনির্বাপণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বড় বড় ল্যাডার ব্যবহার করেন। নিজস্ব ব্যবস্থা ছাড়াও আশপাশের ভবনের রিজার্ভ ট্যাঙ্ক থেকে পানি সরবরাহ করে ল্যাডার দিয়ে ভবনের বাইরে থেকে পানি ছিটানো হয়। এ ছাড়া বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার থেকেও ভবনের ওপর থেকে পানি দেওয়া হয়েছে। হেলিকপ্টারের মাধ্যমে ২২ তলা ভবনের ছাদে আটকাপড়া অনেককে উদ্ধার করা হয়। ভবনের ভেতরে আটকেপড়াদের নামিয়ে আনা হয়েছে ল্যাডারের মাধ্যমে। উদ্ধার অভিযানের সময় ভবনের ভেতরে আটকেপড়া অনেকে প্রাণ বাঁচাতে জানালার পাশে এসে হাত ও গায়ের জামা নাড়িয়ে নিজেদের অবস্থানের জানান দেন। এ সময় নিচে অপেক্ষমাণ স্বজনের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। একে একে আটকেপড়াদের উদ্ধার করে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বনানী ক্লিনিক, অ্যাপোলো, ইউনাইটেডসহ আশপাশের অনেক হাসপাতালে। হাসপাতালে তৈরি হয় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। ড্রোন ব্যবহার :অগ্নিকাণ্ডের পর বিকেল ৫টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধোঁয়ার কারণে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। অক্সিজেন মাস্ক পরে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা গেছে। ভবনের ভেতরে অগ্নিকাণ্ডে আহত কিংবা নিহত কেউ আছেন কি-না, তা জানার জন্য ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। বহুতল ভবনটিতে দ্য ওয়েভ গ্রুপ, হেরিটেজ এয়ার এক্সপ্রেস, ডর্ড, আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড ছাড়াও অর্ধশতাধিক অফিস রয়েছে। রাফসান নামে এফ আর টাওয়ারের একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, ভবনটির নিচতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত খাবার, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন সামগ্রীর দোকান এবং একটি মানি এক্সচেঞ্জ রয়েছে। তৃতীয় থেকে অষ্টমতলা পর্যন্ত রেস্তোরাঁ ও একটি কনভেনশন সেন্টার রয়েছে। নবম তলা থেকে ওপরের ফ্লোরগুলোতে বিভিন্ন বায়িং হাউস, ট্রাভেল এজেন্সি এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অফিস। একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ২২ তলাবিশিষ্ট এফ আর টাওয়ারের সিঁড়ির মাত্র তিন ফুট চওড়া। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, এত বড় বড় ভবনে ওঠা-নামার জন্য মাত্র ৩৬ ইঞ্চি আয়তনের সিঁড়ি! এটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। গতকাল রাতে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ও ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। ধ্বংসস্তূপ থেকে বেরিয়ে আসছিল লাশ :সন্ধ্যা ৭টার দিকে আগুন নেভানোর পর ধ্বংসস্তূপ থেকে একের পর এক লাশ বের করে আনা হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বিভিন্ন তলায় গিয়ে নিথর দেহের সন্ধান পান। নিহত অনেকের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন- পারভেজ সাজ্জাদ (৪৭), আমেনা ইয়াসমিন (৪০), মামুন (৩৬), আবদুল্লাহ আল ফারুক তমাল (৩২), মাকসুদুর (৬৬), মনির (৫০), শ্রীলংকার নাগরিক নিরস চন্দ্র, মনির হোসেন সরদার (৫২), মাকসুদুর রহমান (৪৫), মামুন (৪০), নাহিদুল ইসলাম, রেজাউল করিম রাজু, জেবুন্নেসা, রুমকি আকতার, ফজলে রাব্বি, আমির হোসেন রাব্বি, মির্জা আতিকুর রহমান, মনজুর হাসান, শেখ জারিম। নিহতদের মধ্যে মামুন, মনির হোসেন ও মাকসুদুর রহমানের লাশ ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে গতকাল রাতেই তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন) সাজ্জাদুর রহমান শুভ সমকালকে বলেন, তারা তিনজন লাফ দিতে গিয়ে নিচে পরে নিহত হন। তিনজনই হেরিটেজ গ্রুপে চাকরি করতেন। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি :এদিকে নিহতের সংখ্যা নিয়ে গতকাল বিভ্রান্তি ছড়ায়। অনেক গণমাধ্যমে এ সংখ্যা '২৫' বলে প্রচার করে। মূলত ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বোর্ডে কিছু সময়ের জন্য ২৫ জন নিহত হয়েছেন বলে তথ্য দেওয়া হয়। পরে তারা জানায়, ছয়টি লাশ দু'বার গণনা হওয়ায় সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়িয়েছে। নিহত হয়েছেন ১৯ জন। তবে সমকালের পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাশ রয়েছে ৯টি, সিএমএইচে ৫টি, কুর্মিটোলায় ৬টি। এ ছাড়া ইউনাইটেড হাসপাতাল থেকে ৩টি লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। এ হিসাবে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় '২৩'। তবে এ ব্যাপারে দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ।
পড়া হয়েছে 49 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: শুক্রবার, 29 মার্চ 2019 10:39