09162019সোম
মঙ্গলবার, 01 অক্টোবার 2013 08:59

সচিবালয়ে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা

সিদ্দিকুর রহমান
প্রশাসন পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিএনপি ও জামায়াত অনুসারী কর্মচারীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। কর্মচারীদের কিছু দাবি আদায়ের নামে যে কোনো মুহূর্তে এ ঘটনা ঘটতে পারে। সরকারের ওপর প্রশাসনও বিগড়ে যাচ্ছে দেশ-বিদেশে এমন ধারণা ছড়িয়ে দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। সচিবালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, সচিবালয়ের বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক কর্মচারীরা বাইরের মূল দলের ইন্ধনে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে শোডাউন করতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে। সরকার সমর্থক কর্মচারী সংগঠনগুলোর বিভেদকে পুঁজি করেই তারা এগুচ্ছে। সচিবালয়ে সরকারবিরোধী শোডাউন করতে পল্টন, নয়াপল্টন, সেগুনবাগিচা ও মতিঝিল এলাকার অফিস ও হোটেলে তারা দফায় দফায় বসছেন। এর অনেক খবর সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাছে নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াত সমর্থক চিহ্নিত কিছু ক্যাডার কর্মকর্তা এর পেছনে রয়েছেন। এর মধ্যে পদোন্নতিবঞ্চিত ও অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা আছেন। কর্মচারীদের সামনে রেখে শোডাউনের নেতৃত্বে আছেন তারা। বিগত বিএনপি আমলে প্রশাসনে যে ‘জনতার মঞ্চ’ সৃষ্টি হয়েছিল তারই জবাব দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম সরকারি কর্মচারীদের সরকারি নির্দেশনা অনুসারে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বুধবার বলেছেন, সরকারের কর্মকর্তা যারা আছেন, তাদের আমাদের কথা অনুযায়ী চলতে হবে। যারা নির্দেশ মানবেন না তাদের কপালে দুঃখ আছে। নির্দেশ না মানলে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হবে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াত অনুসারী কর্মচারীদের মধ্যে বিভেদের কথা বলা হলেও তারা নিজেদের প্রয়োজনে ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যে লোকদেখানো বিভেদের রাজনীতি করছেন তারা। এখন তারা একত্র হয়েছেন। যে কোনো দিন সচিবালয়ে ফুঁসে ওঠার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকার সমর্থক কর্মকর্তা ও কর্মচারী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বের কোন্দল চলছে। এই কোন্দলের পেছনে রয়েছে নেতৃত্ব ধরে রাখা, ব্যক্তি স্বার্থের দ্বন্ধও সমবায়ের অধীনস্ত  প্রতিষ্ঠানগুলোর বাণিজ্য দখলে রাখা। যখন যে সরকারই ক্ষমতায় থাকে সেই সরকার অনুসারী কর্মচারী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকে সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো। এটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। সরকারি দলের সমর্থিত সংগঠনগুলোর নেতারা কয়েক গ্রুপে বিভক্ত হয়েছে পড়েছেন। তাছাড়া সরকারের মেয়াদ ঘনিয়ে আসায় তাদের মধ্যে নীরবতা চলে এসেছে। এসব কারণে বিএনপি ও জামায়াত অনুসারী কর্মচারীরা দিন দিন উদ্দীপ্ত হচ্ছে।
বিএনপি সমর্থিত কর্মচারী সংগঠনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মানবকণ্ঠকে জানিয়েছেন, সচিবালয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। তার ভাষায় সরকারকে ‘ঠান্ডা মাথায়’ চপেটাঘাত করা হবে, যাতে আর উঠে দাঁড়াতে না পারে।
সরকার সমর্থিত কর্মচারী সংগঠনের সদ্য অবসরে যাওয়া নেতা আরজ আলী মানবকণ্ঠকে বলেন, বিএনপি-জামায়াত সমর্থক কর্মচারীরা সচিবালয়কে অস্থির করতে অনেক আগ থেকেই কাজ করছে। কখন, কোথায়, কী করছে, সেদিকে আমাদের নজর আছে। বিষয়টি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলকে জানানো হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে পড়ার মতো তৎপরতা নেই বললেন তিনি।
বাংলাদেশ সচিবালয় প্রশাসনিক কর্মকর্তা সমিতি ও পার্সোনাল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে ১১ দফা দাবিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গণসংযোগ করেছে। কর্মকর্তা সমিতির নেতৃত্বে আছেন সভাপতি মোঃ সুলতান আহমেদ, কার্যকরি সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন বখতিয়ার, সাধারণ সম্পাদক মাহে আলম। পার্সোনাল অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনে আছেন সভাপতি নজরুল ইসলাম, কার্যকরী সভাপতি হাবিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন। তাদের দেয়া ১১ দফা দাবির মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে- নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বৃদ্ধির কারণে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দুরবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ৫০ ভাগ মহার্ঘ ভাতা বা ৪টি ইনক্রিমেন্ট, চিকিৎসাভাতা ২ হাজার টাকা, শিক্ষাভাতা ১ হাজার টাকা, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের সচিবালয়ের সহকারী সচিবের মোট পদের ৫০ ভাগ পদে পদোন্নতি এবং আনুপাতিক হারে সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব ও তদূর্ধ্বে পদোন্নতির ব্যবস্থাকরণ; সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী পে-কমিশন/২০১৩ গঠন ইত্যাদি।
এসব দাবি আদায়কে ঘিরে সচিবালয়কে অস্থির করার তৎপরতা চলছে। বিরোধী সমর্থক কর্মচারী সংগঠনের নেতারা জানিয়েছেন, সরকার তাদের দাবি না মানলে তারা অফিসে থেকেও কোনো কাজ করবেন না।
সরকার সমর্থক কর্মচারী সংগঠনের মধ্যে বিভক্তি : আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের শুরু থেকেই সরকার সমর্থক দুটি গ্রুপই নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে কর্মরতএক কর্মচারী জানান, সচিবালয় সমবায় সমিতির সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেয়াসহ মগবাজারের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতির অফিসের চেয়ার দখলকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর ধরে সচিবালয়ে কর্মচারী সংগঠনগুলোর মধ্যে বিরোধ আর বিশৃঙ্খলা লেগেই আছে। সচিবালয় সমবায় সমিতির অধীনে কয়েকটি ক্যান্টিন ও দোকান রয়েছে। বিপরীতে মগবাজারের চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতির কেন্দ্রীয় অফিসের জায়গায় রয়েছে ৮টি দোকান। এছাড়া ফ্লাইওভার নির্মাণকে কেন্দ্র করে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী অফিসের কিছু জায়গা সরকার প্রায় ১ কোটি টাকা মূল্যে অধিগ্রহণ করে নিয়েছে। এই টাকার নিয়ন্ত্রণ নিতেও কয়েকটি মহল মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে।
সচিবালয় সমবায় সমিতির সম্পাদকের দায়িত্ব পেলে এবং দেশের কর্মচারী অঙ্গনের সবচেয়ে বড় সংগঠন চতুর্থ শ্রেণী কর্মচারী সমিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে নেতৃত্বের সব স্বাদই নেয়া সম্ভব। আর এই স্বাদ নিতেই যত দ্বন্ধআর বিপত্তি। সরকার বদল হয়, কিন্তু এই স্বাদ গ্রহণের চরিত্র বদল হয় না। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন তাদের সমর্থক প্রভাবশালী কর্মচারী সংগঠন এ দুই চেয়ার দখল করে নেয়। নির্বাচন দেয়ার নাম করে ৩ মাস পর পর সচিবালয় সমবায় সমিতির কমিটি পুনর্গঠন করা হয়। কিন্তু নির্বাচন আর হয় না। কোনো কোনো কমিটি নানা অজুহাতে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে। আর সমবায় সমিতির প্রতিটি কমিটির বিরুদ্ধে রয়েছে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। আছে অডিট আপত্তি। কিন্তু এ পর্যন্ত  কারও কোনো শাস্তি হয়নি।
বর্তমানে সচিবালয়ে সরকার সমর্থক প্রভাবশালী সংগঠনের নাম সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ। যার সভাপতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আবদুল কুদ্দুস খান ও মহাসচিব হিসেবে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ রহুল আমিন। ঐক্য পরিষদের অঙ্গসংগঠন হিসেবে প্রশাসনিক কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হাসান ইমাম ও মহাসচিব স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ রহুল আমিন।
এদের প্রতিপক্ষ গ্রুপের সংগঠনের নাম সচিবালয় কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ। এরা সরকার সমর্থক মিলন গ্রুপ নামে পরিচিত। এই সংগঠনের সভাপতি নিজামুল ইসলাম ভূঁইয়া মিলন ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের হিসাব শাখার কর্মকর্তা আতিকুল ইসলাম সুমন। এই গ্রুপের অফিস সহকারী সমিতির সভাপতির পদটি বর্তমানে খালি রয়েছে। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন অর্থ বিভাগের হুমায়ুন কবির।
সরকার সমর্থিত কর্মচারী সংগঠনের নেতারা ব্যক্তি স্বার্থে বিভক্ত হয়ে পড়ার খেসারত সরকারকে যে কোনো মুহূর্তে দিতে হতে পারে।

পড়া হয়েছে 602 বার। সর্বশেষ সম্পাদন করা হয়েছে: মঙ্গলবার, 01 অক্টোবার 2013 09:05